,

নজরুল ইসলাম তোফা’র শুভ জন্মদিনে শৈশর থেকে আজ অবধি জীবন কাহিনী

ভোর হলো দোর খোল খুকু মনি উঠোরে এ ভাবে আমাকে ডেকে উঠিয়ে বাবা কোলে নিয়ে আদর করতেন আমার শৈশবে। আমিও নাকি সে ডাকে সাড়া দিয়ে বাবার সঙ্গে আধো আধো অস্পষ্ট কথায় মগ্ন হতাম। আমার ছোট চোখ যেন স্বপ্ন দেখতো, বাবা সে সময় ধরে রাখার ক্যামেরা পাননি, আমার ছোট বেলার প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি দিন, অতীতের সে স্বপ্ন ধরে রাখা একেকটা ছবি মহা মূল্যবান কাব্য’তে রুপ নিয়েছিল নাকি। আমার বুকের ভেতরের শ্বাস-প্রশ্বাসের যন্ত্রটা নাকি পৃথিবীর সর্বোচ্চ গুদাম, তাইতো সেখানে সুরকে বেঁধে রাখি পণ্যের বস্তার মতো। আরো আরো রয়েছে আমার অনেক ছেলেবেলার সেই সু- মধুর সময়। কাজী নজরুল ইসলামের খুব ভক্ত ছিলেন আমার বাবা। সেহেতু আমার নাম রেখেছিলেন নজরুল ইসলাম তোফা। কাজী নজরুলের ‘তোফা’ নাকি আমি। এ উপহার পেয়েছে আমার বাবা আমার চোখে। দিনে দিনে বড় হই, বুঝতে পারি অনেক কিছুই শুরু হয় গাঁয়ের মেঠো পথে হাঁটা। সূর্য উদয়ের আগে উঠে পথে, ঘাটে, বাজারের পড়ে থাকা ময়লা কাগজ পড়তে শুরু করি। স্কুল আর এমন নেশায় দিন কাটে, পড়ে থাকা কাগজের ছড়া কবিতা পছন্দ হলে কাটিং করে ঘরে এনে আবৃত্তি করে পড়ি। তা বাবা দেখে আনন্দ পেতেন এবং ক্রয় করে দিতেন কাজী নজরুলের ছড়া কবিতার বই।

বহমান জীবনের সাথে বৃষ্টি ঝরার মতো যা কিছু অদৃশ্যভাবে পেছনে হারিয়ে যায় তার মধ্যে শৈশব অন্যতম। স্মৃতির পাঠশালা আর অবুঝ হাসি-কান্নারা শৈশবকে বেশি অনুভব করে বলে হারানো প্রতিটি দিন আর প্রতিটি খণ হয়ে ওঠে এক একটি ডায়েরি। শৈশব ছাড়া কেউ কৈশোর বা দস্যি যৌবনে পা রাখতে পারে না। ফলে শৈশবকে কেউ ডাকলেও আর কাছে আসে না, এটাই বাস্ততবতা।এভাবেই প্রতিটি শৈশব আমার নিজস্ব পরিচয়ে স্বমহিমায় থাকে উজ্জ্বল।

ভোরের পাখির গান বিকেলে ফুলের বাগানে ফুল দেখা। ফুল দেখি, ফুল ছিঁড়ি না। পাখির ডাক শুনি, পাখি ধরি না। গান আর কবিতার সুরে সূর্য্য অস্তমিত করি। রাতের ঝিঝি পোকা, বর্ষায় ব্যাঙের ডাক শুনে দক্ষিণ জানালা খোলা রেখে জোনাকি পোকার পিটির পিটার মৃদু আলো দেখতাম। অন্যদের মতো আমিও একটি ছোট্ট জীবনকে পেছনে রেখে এসেছি। ফেলে এসেছি শিশির স্নিগ্ধ ভোরের আলো, রোদেলা দুপুর আর অলস বিকেল। গাঁয়ের সবুজাভ পরিবেশে কাটিয়েছি এক খণ্ড সোনালি জীবন। বর্ষাবিলে, নদীর জলে দস্যি বালকের মতো পাড়ার ছেলেদের সাথে একাকার হয়ে যাওয়া এবং বাড়িতে গিয়ে মায়ের বকুনি আর বাবার শাসন এসব হলো জীবনের মধুময় শৈশব।

পল্লী পুকুর বা খালের পানি সিঞ্চন শেষে মাছ ধরতে গিয়ে নাকে মুখে কাদামাটির লেপন আমার একমুঠো শৈশবের অংশ। শেষ বিকেলে দখিনা হাওয়ায় ঘুড়ি উড়াতে গিয়ে ফসল খেতের চিকন আলে পা পিছলে সুতো ছিঁড়ে যাওয়ায় কত বিকেল গাছে গাছে হারানো ঘুড়ি খোঁজ করে পার করেছি তার কোনো হিসাব নেই। বাড়ির বাগানে ঝরে পড়া ফুল কুড়িয়ে মালা গাঁথা আর বড় বোনের নকশি করা মেহেদী পাতার রঙ এখনো স্মৃতির সংগ্রহশালায় জীবন্ত হয়ে আছে।

শৈববে ছোটদের জন্য লিখেছি নানান ধরনের ছড়া, কবিতা। বাংলাদেশের নাটক, সিনেমা, ইতিহাস ঐতিহ্য, বিজ্ঞান ও শিল্পের নানা বিষয় সুন্দরভাবে ফুটয়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা থাকতো। দক্ষিণ দিক হতে উত্তর দিকে যাচ্ছে সাদা মেঘের ভেলা। নদীর ধারে ফুটেছে সাদা সাদা কাশফুল। বাতাসে দোল খায়। সাদা বকগুলো উড়ে বেড়ায় আকাশে। লাল, সাদা ও হালকা বেগুনী রঙের শাপলা ফুটে আছে বিলের জলে। দুরন্ত বালকেরা শাপলা তুলে আনে বিল থেকে। তুলে আনে শালুকও। ফোটে শিউলী, কামিনী, হাসনাহেনা। কী চমৎকার সুবাস। রাতে হালকা শিশির পড়ে সবুজ ঘাসের ওপর। বিন্দু বিন্দু শিশির রোদের আলোতে ঝিকমিক, ক্ষুদে বয়সে শিল্পীগিরীর পাইতাড়া আর আশা আকাঙ্খার প্রতিফলনে শরতের শান্ত বিকেলে পুলকিত হতাম। বুদ্ধি সল্পতায়, কল্পনায় জয়নুল আবেদিন সেজে বসতাম। কারণ ক্লাসের শ্রেনীতে জয়নুল আবেদিন চমৎকার ভাবে আমার শ্রদ্ধেয় আফসার স্যার পড়িয়েছিলেন। পাঠ্য পুস্তকে জীবন কাহিনীর এমন করুন রস মিশ্রিত গল্প এক চমৎকার অভিজ্ঞতা।

আমি ভুলতে চাইলেও ভুলতে পারি না। ছোট বেলার সেই দিন গুলি যেন একটা জীবন্ত চিত্র গুলি জীবনের স্মৃতির পাতায় এ্যালবাম হয়ে আমার পেছনে হেঁটে বেড়ায় সর্বক্ষণ। আমাকে মাঝে মাঝে স্মৃতি কাতর করে, টেনে হেঁচড়ে নিয়ে যায় সেই মাটির আঁকা বাঁকা মেঠো পথে, নদীর ঘাটে, হলুদ সরিষা ক্ষেত ফুলের মাঠে, গ্রামের হিমেল হাওয়া দোল খাওয়া সবুজ সবুজ ধানের খেতে। পুকুর জলে শাপলা ফোঁটা, আম গাছ আর স্কুল মাঠের কড়ই গাছের ছায়া, নদীর জলে ডুব সাঁতার, চিৎ সাঁতার, জাম গাছের মগ ঢাল, তেঁতুল গাছের টক, বালিচরে পাকা তরমুজ, শীতের সকালে কুয়াশা চাঁদরে মোড়া খেজুর গাছের রস। সুনিবিড় শান্তির নীড়, দক্ষিণের খোলা জানালা, আমাকে আজও হাতছানি দিয়ে জাগ্রত করে।

ছোট বেলায় গ্রামের মাটির ঘর বাঁশের বেড়া খড় দিয়ে বাঁধা চাল, ঘন সেই সবুজ প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে এবং শ্বাস-নিশ্বাস নিয়ে বড় হয়েছি। এখনকার শহরে ইট পাথরের জীবন যখন হাঁপিয়ে উঠি, বুকের ভিতরে জমানো হতাশাটা যখন বাতাসে ভাসিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে আরামদায়ক খাটে শরীরটা হেলিয়ে নিদ্রা দেই, তখন আমার চোখের সামনে খেলা করে দিগন্ত বিস্তৃত শস্য-শ্যামল সবুজ খোলা মাঠ, নীল আকাশের মুক্ত তারা, সোনালী ধানের শীষ।

আমি তখন আগের মতোই শৈশবের সেই রাখালের মধুমাখা বাঁশির সুর শুনি, মাঝির দরদি কণ্ঠের ভাটিয়ালি গান। আমি শৈশবের জীবনকে যতই পথের বাঁকে পিছনে ফেলে আসছি, ততই বর্তমানে গ্রামের জীবনের সাথে খাপ মিলাতে না চাই, ততই ফিরে যাই আমার শৈশবের মায়ের কোলে। আমার ফেলে আসা শৈশব-কৈশোরের দিনগুলো আমাকে তাড়িত করে মৌলিক জীবনের পথে। আমি ভুলে যাই কি করে? সেই মেঠো পথ, সতেজ বাতাস, পাখির গান, ফুলে ফুলে প্রজাপতির নাচ।

শৈশবের প্রতিটি মুহূর্ত যেখানে একেকটা মহামূল্যবান সংগ্রহশালা, সেখানে শৈশবের সংগ্রহশালা থেকে একটি স্মৃতিও বাদ দেওয়া যায় না, বারবারই চলে আসে স্মৃতির পাতায়। কোনটাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করি, কোনটাকে নিয়ে স্বপ্নের তুলি দিয়ে ছবি আঁকি। শৈশবের প্রতিটি দিন যেখানে মধুভরা, আনন্দময় ছিলো সেখানে কোন দিনটা বিশেষ ভাবে স্মরণ করি।

বিকেল বেলায় বাড়ির পাশে স্কুল মাঠে বন্ধুদের সাথে খেলার পর পাশের বাড়ি সন্ধ্যায় ঢুকে পড়ি টিভি দেখতে। তখন আমাদের টিভি ছিলো না। একমাত্র চ্যানেল বিটিভিতে প্রচারিত অনূষ্ঠান যা হতো সবকিছুই যে আমার ভালো লাগতো তা না। শিশুদের অনুষ্ঠান কার্টুন, ছড়া কবিতা, আঁকিবুকি আর এ্যানিমেশন কি জিনিষ না বুঝলেও কেন যে ভালো লাগতো। আমি বন্ধুদের চেয়ে বেশ আলাদা এগুলো তাদের ভালো না লাগলেও আমার কাছে জীবন্ত হয়ে ছটোছুটি করতো। সিনেমা, নাটক গানের চরম পোকা ছিলাম, কি যে মজার শৈশব, এর চেয়ে মজা আর কিবা হতে পারে? শুধু শৈশবের আনন্দই তো এগুলো। যতক্ষন চলত টিভির সামনে হা হয়ে বুদ হয়ে তাই গিলতাম।

আমার পছন্দের খাদ্য তালিকায় মজার আইসক্রিম জিনিসটির উপস্থিতি ছিল বাধ্যতামূলক। তাছাড়া় মধু, ফল, দুধ এবং টাটকা শশার এক অপূর্ব চাহিদার সংমিশ্রণ। এগুলি আমার স্মৃতির উর্বর শক্তি, তা আজ এক বিশাল সংগ্রহশালা। প্রতিটি মানুষের শৈশব-কৈশোরের দুরন্তপনা আর ডানপিটে জীবন যাপনের ফ্ল্যাশ ব্যাক এমন নাও হতে পারে। সুতরাং আমি একটু আলাদা ধাচের মানুষ, কিন্তু কেন এমন মানুষ হলাম তার ব্যাখ্যা জানি না। আমরা যারা শরীর থেকে সেই ছোট গ্রামের কাঁদা আর ধূলা মাটির সোঁদা গন্ধ মুছে দিয়ে আধুনিক হবার জন্য ব্যস্ত, তাঁরা আমার মতো চোখ বন্ধ করে দেখুন তো, আসলে কি বলতে পারবো না, ছোট বেলায় খড়কুটো দিয়ে বল বানিয়ে উঠানে বা স্কুল মাঠে সাথীদের নিয়ে ফুটবল খেলিনি? হাডুডু, বৌ চুরি, কাঠের টুকরো দিয়ে ব্যাট বানিয়ে টেনিস বল দিয়ে বাড়ির উঠানে বা স্কুল মাঠে খেলিনি?

আজ শৈশব কাটিয়ে কৈশোর, কৈশোর কাটিয়ে পূর্ণ যৌবনে। কর্মে ব্যস্ততায় কাটে সর্বদা। সুনাম কখন কিভাবে আসে জানা নেই। তবে জানা আছে বই সংগ্রহ করে পড়লে জ্ঞানি হওয়া যায়। তাই বই সংগ্রহ করি। ‘শুনেছো- ঠিকই শুনেছো। কেন সুনাম থাকবে না বলো? কতকাল ধরে কৃতিত্বের সঙ্গে এ কাজ করে আসছি’ শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘স্বর্গে কিছুক্ষণ’ নাটকের সংলাপ এটি। মাঝে মধ্যেই এ গ্রন্থটি পড়ে মজা পাই। যেখানে যে অবস্থায় থাকি, সংগ্রহের নেশা আর অভিনয় হৃদয়ে সব সময় কলরব করে।

আমাকে গ্রন্থ-প্রেমী এক সরল মনা অভিনেতা বললে ভুল হবে না। কারণ, শিমুল সরকারের এক নাটকের শুটিং স্পটে অভিনেতা আনিছুল হক বরুণ ভাই বলেছিলেন, এতো সরল কেন আপনি? “এতো সরল ভালো না, মিডিয়া জগৎ জটিল ব্যক্তির ক্রিমিনালের জায়গা” আমি বলেছিলাম, সরলতা দিয়েই এতো দুর পথ অগ্রসর, বাঁকি পথটুকু জটিল বা ক্রিমিনাল হতে চাই না ভাই। আবার তিনি বলেছিলেন, আপনি ভালো আছেন ভালোই থাকেন। আপনার মতো মানুষ মিডিয়া জগতে আমাদের সততা ও আদর্শের সুন্দর এক উদহারণ।

বলে রাখি, গ্রামের মেঠো পথের পাশ দিয়ে বহমান আত্রাই নদীর তীরে ছিলো আমার অবাধ বিচরণ। নওগাঁ জেলার কশব ইউনিয়নে আমার স্থায়ী ঠিকানা। মোঃ কমর উদ্দীন শাহানার দ্বিতীয় সন্তান আমি নজরুল ইসলাম তোফা। গ্রামের স্কুল পঞ্চম শ্রেণী আর চকউলী বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে এস এস সি’র পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা বিভাগে ভর্তি হই। তারপর প্রচণ্ড স্বপ্নবাজ হয়ে উঠি গ্রন্থ-প্রেমে ও নাট্যাঙ্গনে।বিশ্ববিদ্যালয়ের শিল্প চর্চার ক্লাস করে, বই পড়ে, নাটক করেই প্রতিটা দিন পার করতাম।

আমার জন্ম পাঁচ জুলাই উনিশ শত পঁচাত্তরে নিজ গ্রাম পাঁজর ভাঙ্গায়। এখন থাকি রাজশাহীর বর্নালীর মোড় হেতেম খাঁস্থ গ্রীন গার্ডেন টেকনিক্যাল এন্ড বিএম কলেজের পাঁচ তলা ভবনের একেবারে নিচ তলায়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা থেকে পড়াশোনা শেষ করে রাজশাহী চারুকলা মহাবিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পাশাপাশি অভিনয় করি। গ্রন্থ-প্রেমী ও নাট্য সমগ্র সংগ্রহে নেশা পূর্ন ভাবে শুরু করি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুতেই। নান্দনিক দৃষ্টিতে বলা চলে, ঘরে অসংখ্য বইয়ের পসরা সাজিয়েও রেখেছি। বইগুলো শুধু সংস্কৃতিমনা মানুষদের ভালো লাগবে মনে করি। শুধু বই ক্রয় করে সেলফে রাখিনি, কাজের ফাঁকে ফাঁকে প্রতিদিন একটি হলেও নাট্য পান্ডুলিপি পড়ি। কেন জানি আমার মনের ক্ষুধা অনেক বড়। সে ক্ষুধা মেটানোর জন্য আমি যখনই সুযোগ পাই তখনই বই পড়ি।

শৈশবে আমি নজরুল ইসলাম তোফা স্কুল ও পূঁজা পার্বণে যাত্রা করেছি। গ্রামে গ্রামে ঘুরে অভিনয় ও কৌতুক করে মানুষ হাঁসিয়েছি। সে যাত্রা ও কৌতুক পরিবেশনের পাণ্ডুলিপি কপি করতে হতো হাতে লিখে। সে গুলো আমাকেই করতে হতো, পাশাপাশি যারা তাঁর সঙ্গে অভিনয় করতেন তাঁদের প্রম্পট ও অভিনয় শিখিয়ে দিতাম। এভাবেই আমি বই পড়ার নেশা ও অভিনয়ের নেশা সহ শিল্পচর্চার নেশা পেয়ে বসি। অনেক পরে অবশ্য ভিডিও নাটকে অভিনয় শুরু করি। এলাকাজুড়ে সমালোচিত হতে শুরু করি, কারণ নদীর পাড়ে কড়ই গাছের গোড়ায় স্কুল মাঠে উচ্চ স্বরে হেলে দুলে অভিনয় চর্চা আর মাঝে মাঝে বিরতি নিয়ে চিত্রকর্ম চর্চা, সবই ছিল পাগলের মতো। তারই ফলশ্রুতিতে প্রায় সাড়ে তিন হাজার নাট্য সমগ্র গ্রন্থ। যে কারণে কোনো প্রহসন নয়, অনুপ্রেরণার গল্পই বলা চলে।

কোনো দুর্লভ ও ব্যতিক্রমধর্মী নাট্য সমগ্র বই সংগ্রহের প্রয়োজন পড়ে, সবার আগে মনে পড়ে রাজশাহীর বুক পয়েন্টের মালিক চন্দন দার কথা। তিনি কলকাতা ও ঢাকা গিয়ে আমাকে মনের খোরাক মেটানোর জন্য নাট্য সমগ্র এনে দিতেন। নিজস্ব বুদ্ধি দ্বীপ্ত চেতনায় বই পাগল নাট্যপ্রেমী বলা চলে, চ্যানেল নাটকে অভিনয় করার সুয়োগ পেয়েছি এবং করছি। আশ্চর্য্য জনক তথ্য হলো নাট্যগুরু শিমুল সরকার ব্যথিত এপর্যন্ত কারও কাছে অর্থ নেয়নি। ক্রাইম প্রেট্রোল ধারাবাহিক নাটকে আমাকে পারিশ্রমিক দেওয়া হয়েছিল একজনের মাধ্যমে আমি তা না নিয়ে উনাকেই দিয়েছি। তাঁর নাম প্রকাশ নাইবা করি। আমি গ্রন্থ বা নাট্য সমগ্র ক্রয় করে নিজস্ব শৈল্পিক চিন্তায় বইয়ের মলাট করে রাখি তুলি কলম দিয়ে পূর্নাঙ্গভাবে প্রচ্ছদ অংকন করে। শুধু তাই না সেই গ্রন্থগুলোকে ক্রমিক নম্বরের আওতায় এনে একটি ডায়রিতে ক্রমিক নম্বর অনুযায়ী লিপিবন্ধ করে রেখি রীতিমত আনন্দ পেলাম হাতের লেখা দেখে একেবারে বিদ্যাসাগর টাইপ করে লিখতে পারি বলে সবাই প্রশংসা করে, আনন্দ পাই। আর হাতের লেখা ভালো হবেই বা না কেন? আমি তো চারুকলার ছাত্র, এখন চারুকলার শিক্ষক। শৈশবে মায়ের হাতের লেখাও সুন্দর ছিল। যেমন আমরা বলে থাকি মাতৃভাষা মায়ের কাছে সবচেয়ে আগে শেখা যায় এবং ভালো হয়। ঠিক তেমনি আমার মায়ের কাছেই মাতৃভাষা শেখা ও হাতের সুন্দর লেখা শেখা। স্কুলে প্রদ্ধেয় ছবের স্যারেরও ভূমিকা কম ছিলো না। এখন বলে চলে প্রয়োজনেই গ্রন্থে গ্রন্থে মজা করে চমৎকার লেখা লিখি, না লিখলে ভালো লাগেনা, মনোযোগ আকর্ষণ করে না।

দেশি বিদেশি লেখকদের লেখা নাটকের সমগ্র সংগ্রহ করেছি। বর্তমানে আমার সংগ্রহে রয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, উৎপল দত্ত, বাদল সরকার, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, বুদ্ধদেব বসু, শরবিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, অলোক রায়, শুম্ভ মিত্র, মনোজ মিত্র, রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত, নভেন্দু সেন, চন্দন সেন, লোকনাথ ভট্টাচার্য, ধনঞ্জয় বৈরাগী, ব্রাত্য রাইসু, সেলিম আল দীন, আব্দুল্লাহ আল মামুন, মামুনুর রশীদ, হুমায়ূন আহমেদ, মান্নান হীরা, মমতাজউদ্দীন আহমদ, রামেন্দ্র মজুমদার, আলী যাকের, আসাদুজ্জামান নূর, আহম্মেদ সফা, আবুল হোসেন, সিকান্দার আবু জাফর, প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক সহ দেশি বিদেশি খ্যাতিমান সব লেখকদের বাংলা ভাষায় লেখা নাটকের অনেক রুচিশীল নাটক সমগ্র। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা চলাকালীন থেকেই বই সংগ্রহের নেশা আমাকে পেয়ে বসে। আমার সংগ্রহে রয়েছে প্রথম শ্রেণী থেকে শুরু করে শিক্ষা জীবনে কেনা সব বই-ই।

তবে নাটকের সমগ্র সংগ্রহের নেশা তৈরি হয় ১৯৯২ সালের দিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা বিভাগে ভর্তি হবার পরে। নাটকের গ্রন্থ সংগ্রহের বিষয়ে আমার একটি চমৎকার ঘটনা আছে,‘২০১০ সালের দিকে আমি পরিচালক শিমুল সরকারের ধারাবাহিক নাটক ‘চোর কাব্য’তে কাজ করতে ঢাকাই গিয়েছি। শ্যুটিং শেষে মনে পড়লো আমার প্রয়োজনিও একটি ‘টিভি নাটক সমগ্র’ দরকার। রাজশাহীর চন্দনদার বুক পয়েন্ট দোকানে, বইয়ের তালিকায় খোঁজে পেলাম বইটির প্রকাশনির নাম ও বইটির শিরোনাম ‘টিভি নাটক সমগ্র’। যথারিতি শুটিং শেষে বইটি সংগ্রহ করার জন্য গেলাম ঢাকার নিলক্ষেতে। সেখানে গিয়ে আমাকে পড়তে হয় ভোগান্তিতে। আমার পরনে থাকা শার্ট ছিঁড়ে যায় রিকশায় বেঁধে। আমি ছিঁড়া শার্ট পরেই মার্কেটের ভিতরে ঘুরতে থাকি। নতুন শার্ট কেনার জন্য না, বইটি কেনার জন্য। মনটা খারাপ হলেও শার্ট কেনার জন্য কোন আগ্রহ ছিল না। কারণ শার্টের চেয়ে বইটি আমার বেশি প্রয়োজন ছিল তখন’। আসলে সে সময়ের বিষয় হলো চাইলেই হয়তো শার্ট কিনে নিতে পারতাম, তবে শার্ট কিনলে গ্রন্থটি কেনার টাকা হতো না। মনো স্থির হয়েছিল বইটিই কিনে ফেললাম। ঢাকা থেকে বাড়িতে ফেরার টাকা ব্যতিত পকেটে তখন ছিলো মাত্র পাঁচশো টাকার মত। আগেই বলেছি নাটকের কাজের পারিশ্রমিক চেয়ে নেয়না। আমার বাবা হঠাৎ একদিন বলে বসেন, এতো বই সংগ্রহ করছো কি হবে এতো? উত্তরে আমি বলেছিলাম, বই আমার অপূর্ণতাকে কাটিয়ে উঠার সহায়ক হচ্ছে, তাছাড়া তুমি তো একদিন থাকবে না। তখন আমার ছেলেকে বলবো, আমার বাবা আমাকে এই লাইব্রেরি করে দিয়েছে। তুমিও তোমার সন্তানকে বলবে। আমার বাবা সেই সময় কান্না জড়িত কন্ঠে বলেছিল, তোমার চিন্তা চেতনার জায়গা আমি বুঝি। তারপর আর বাবা আমার বই সংগ্রহ নিয়ে কোন কথা বলেননি। এটি ছিলো আমার বই সংগ্রহের বড় শক্তি।

গ্রন্থ সংগ্রহ করতে করতে বর্তমানে আমার সংগ্রহে শুধুমাত্র নাটকের সমগ্র গ্রন্থ রয়েছে প্রায় সাড়ে তিন হাজার তার মধ্যে আবার একত্রে বেশ কয়েকটি করে রয়েছে নাটকের পান্ডুলিপি। আমার সংগৃহীত বইয়ের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ, ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের খ্যাতিমান লেখকদের বাংলা ভাষায় লেখা নাট্যসমগ্র ও বাংলা অনুবাদ নাট্যসমগ্র গ্রন্থ। সেই গ্রন্থগুলো দিয়ে নিজের বাড়িতে তৈরি করেছি একটা সংগ্রহশালা।

কেন এতো নাট্যসমগ্র সংগ্রহ করেছি আবার এখনো সংগ্রহ করে যাচ্ছি এবং সেগুলোকে সযত্নে সংরক্ষণ করি জানতে চাইলে আমি বলবো, ‘ছোট বেলা থেকেই আমি নাটকে অভিনয় করি আর নাটকের বই পড়তে করতে ভালোবাসি। স্কুলে পড়াকালে মঞ্চ নাটকের মধ্যে দিয়ে শুরু হয় আমার নাটক বা অভিনয় করা। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পর নাট্যগুরু পরিচালক শিমুল সরকারের সঙ্গে থিয়েটারে যুক্ত হই। এভাবে নাটক করতে করতে একসময় টিভি নাটকে কাজের সুযোগ পাই। কিন্তু সেখানে গিয়ে কাজ করার সময় নিজের ভিতরে কিছু অপূর্ণতা আছে বলে মনে হয় আমার। সেই অপূর্ণতাকে কাটিয়ে উঠতে আর নাটক ও অভিনয় সম্পর্কে আরো বেশি জ্ঞানার্জনের লক্ষে বিভিন্ন খ্যাতিমান নাট্যকার ও লেখকদের লেখা নাট্যগ্রন্থ সংগ্রহ করে পড়তে শুরু করি। এভাবেই আমার সংগ্রহে জমা হতে থাকে একের পর এক নাট্যগ্রন্থ।

এ পৃথিবীতে অধিকাংশ মানুষের জীবন ভাবনা থাকে, থাকে স্বপ্ন। কিছু মানুষ আছে যাদের মধ্যে স্বপ্নের জগৎ অনেক বড়। আমিও সেই ভবিষ্যত স্বপ্ন পরিকল্পনায় স্বপ্নবাজদের দলে। এসব নাট্যগ্রন্থ নিয়ে ভবিষ্যতে কিছু করার অনেক পরিকল্পনা আছে আমার। ‘এসব কাগজের গ্রন্থ তো বেশি দিন অক্ষত অবস্থায় সংরক্ষণ করা সম্ভব না। সে জন্য এসব মূল্যবান গ্রন্থগুলোকে অক্ষত অবস্থায় সংরক্ষণ করার জন্য আমি এগুলোকে ই-বুকে রুপান্তরিত করে ই-লাইব্রেরি (অনালাইন আর্কাইভ) তৈরির পরিকল্পনা করছি। যাতে সযত্নে নিজের সংগ্রহে রাখার পাশাপাশি গ্রন্থগুলোর দ্বারা অন্যদের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে সহায়তা করতে পারি’।

গুনি মানুষ ও মেধা সম্পন্ন-মানুষেরাই শুধু পারে একটি বড় দেশ আর বড় জাতিকে গড়ে তুলতে। আমাদের সামনে আগামি দিনের যে মহান বাংলাদেশ অপেক্ষমাণ তার জন্য অনেক জ্ঞান চর্চার প্রয়োজন। আমার বইগুলো ই-লাইব্রেরি মাধ্যমে তরুন নির্মাতাদের নির্মাণের জন্য অনেক সমৃদ্ধ করবে নির্মাণ শৈলী। মানবসভ্যতার শুরু থেকে আজ অবধি শ্রেষ্ঠ নাটক সমগ্র একের পর এক বাহির করছি এবং এ গ্রন্থ গুলো নাট্যাভিনেতা নিয়োমিত পড়াশুনার ভেতর দিয়ে দেশের মানুষের চেতনা জগৎকে বড় করে তোলার উদ্দেশ্যে নানান কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে। তাই আমি জ্ঞানচর্চাকে সারা দেশের প্রতিটি অঙ্গনে ছড়িয়ে দেয়ার ইচ্ছা পোষণ করি। নাট্যঙ্গনের সব শ্রেনীর মানুষ বইপড়ার মাধ্যমে রুচিশীল হয়ে ও আদর্শ মানুষ রূপে মিডিয়া জগতে আসুক। তাঁদের উদ্দেশ্যেই মুলত আমার প্রথম বই সংগ্রহ করা। তারই ধারাবাহিকতায় শুরু হচ্ছে ই-লাইব্রেরির উদ্যোগ। বর্তমানে হাতের নাগালে চলে এসেছে তথ্য প্রযুক্তি, এর বহুমাত্রিক ব্যবহার ক্রমশ বাড়ছে। বই আর কেবল কাগজে ছাপা, বাঁধানো মলাট দেয়া পরিসরে সীমাবদ্ধ নেই। কাগজের বইয়ের পাশাপাশি ইলেকট্রনিক বা ই-বুক বা ডিজিটাল ভার্সনে বইপড়ার পাঠক সংখ্যা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। উন্নত বিশ্বে ই-বুক এখন বেশ জনপ্রিয়। আমাদের দেশে ল্যাপটপ, ট্যাবলেট কম্পিউটার, ই-বুক রিডার এবং সাম্প্রতিক সময়ের মোবাইল ফোন সেট গুলো ইলেকট্রনিক বই পড়াটাকে অনেক সহজ করে দিয়েছে।

মফস্বল শহরের গন্ডি পেরিয়ে নিজ গুনেই বলা চলে আমি কঠিন দুর্গম পথ মাড়িয়ে আজ স্থান করিয়ে নিয়েছি জাতীয় পরিমন্ডলে। অভিনয় করছি শিমুল সরকারসহ নামী-দামী পরিচালকদের নাটকে। ইতোমধ্যে নাম কুড়িয়েছিও সুধিমন্ডলে। নিজের লেখা নাটকে রাজশাহী বেতারে গত ১৮ জুন বেলা ৩ টায় (২০১৭) রেকর্ডিং হয় সেখানেও শ্রুতিনাট্য কন্ঠ দিয়েছি। এটিএন বাংলায় প্রতি শনিবার রাত ৮ টা ৪৫ মিনিটে প্রচারিত ধারাবাহিক নাটক ক্রাইম প্রেট্রোলেও অভিনয় করেছি। আলিফ চ্যালেনের অডিশনে টিকে পরিচালক সাজ্জাদ রহমানের তত্ত্বাবধানে ধারাবাহিক নাটকে ৯ থেকে ১১ অক্টোবর তিন দিনব্যাপি নাট্য কর্মশালা করে সফল হয়েছি। পরিচালক অহিদুজ্জামান ডাইমন এর তত্বাবধানে রাজশাহী জোনের নাট্যযুদ্ধে গত শুক্রবার ১/৫/২০১৫ তারিখে রাত ৮টা ৪৫ মিনিটের প্রোগ্রামে এটিএন চ্যানেলে অতিথি শিল্পী হিসাবে ডাক্তার চরিত্রে অভিনয় করেছি। নাটকের নাম হচ্ছে গল্প হলেও সত্যি। নাট্যকার ও পরিচালক শিমুল সরকার এর ধারাবাহিক নাটক সাহস সঞ্চয় ব্যুরোতে ২৮ জুন থেকে প্রচারিত হয়েছিল আর টিভিতে প্রতি রবি, সোম, মঙ্গল ও বুধবার ৭টা ৪০মিনিটে সে নাটকে আমি অভিনয় করেছি। পরিচালক শাহারিয়ার চয়নের নাটক ভূতের শহরে আমি আজব ভূত সেজেছিলাম এবং দর্শক নন্দিত নাটকটি এস মুভিজ টেলিভিশনে গত ২৩/৬/১৫ তারিখে মঙ্গল বার সন্ধ্যা ৭টা ২০ মিনিটে প্রচার হয়েছিল। তাছাড়া পরিচালক আশিক রাজের দুটি নাটকে কাজ করেছি ছেড়া টি শার্ট ও দুষ্টু বালক এবং পরিচালক রোমো রশিদ এর নাটক লাভ স্টেশনেও কাজ করেছি। তরুন নির্মাতা পরিচালক আব্দুল্যা আল মামুন সনেটের ঈদের প্যাকেজ নাটক ‘বাঁকা চাঁদের মিষ্টি হাঁসি’তে মুল চরিত্রে অভিনয় করে আমি দর্শক নন্দিত হয়েছিলাম।

ছোটবেলাতে কাঁদামাটি মেখে ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’ প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ায় মায়ের হাতে মার খেতে ছিলাম মনে পড়ে। আবার আনন্দের দিক হলো, শৈশবে প্রায় প্রতি বছরই আমার হাতে অনেক পুরস্কার আসতো। মুক্তিযুদ্ধ একটি সত্য ঘটনায় আমি মুক্তিযোদ্ধা সেজে মার হাতে মার খেয়েছি। তাতেও আমার আনন্দ। মা বলছিলেন ’এতো ভাল কিছু বিষয় থাকতে গায়ে কাদা মাখিস ক্যান। এমন কথাটির অর্থ আজও আমার মাকে বুঝানো হয় নাই, আমাকে আজও ভাবায়, আজও গায়ে কাদা মাখান অর্থাৎ মাখিয়ে দেন এবং আমিও ইচ্ছে করেই মাখি। বলতে চাই আমার নাট্যগুরু আমাকে কাদা মাখিয়ে পাগল সাজিয়ে মুক্তিযুদ্ধা বানান। তিনি হচ্ছেন নাট্যকার ও পরিচালক শিমুল সরকার। ফিরে যান সেই স্মৃতি মায়ের বকুনীর কাছে গাঁয়ের মানুষের কাছে। গ্রামের মানুষ আজও আমাকে ভালোবাসেন, টেলিভিশনে নজরুল ইসলাম তোফা নামটি দেখে নড়ে চড়ে বসে নাটক শেষ হওয়া পর্যন্ত দেখেন।তবে এই ভালোবাসার ভাগিদার পরিচালক শিমুল সরকার। চোরকব্য ধারাবাহিক নাটকে গায়ে কাদা ও ছিড়া প্যান্ট পরে অভিনয় না করালে অভিনেতা নজরুল ইসলাম তোফা হয়ে উঠতাম না। জীবনের স্মৃতি অনেক…আনন্দ অশ্রুও ঝরবে অনেক। তাই বাঁচি যতদিন ততদিন সংস্কৃতির শাখা প্রশাখায় আমি কাজ করে যেতে চাই।

’মামার হাতে মোয়া’ ধারাবাহিক নাটকে প্রতি মঙ্গলবার ও বুধবার রাত ৯টা ৩০ মিনিটে প্রচার হয়েছিল একুশে টেলিভিশনে। সেখানে তাঁকে টাইটেল সংয়ে উপস্থাপন করেছিলেন। তাছাড়া দুটি আইসিসি বিশ্বকাপের থিম সংয়ে ভিন্ন ভিন্ন পরিচালনায় আশিক উল আলম ও শাহারিয়ার চয়নের সঙ্গে কাজ করেছি। উল্লসিতো বিজয়ের প্রতিক হিসেবে তারকা শিল্পী রুপে নির্মাতারা আমাকে গন্য করে বিভিন্ন কাজে সুয়োগ দিয়েছেন বলে আনন্দ বোধ করছি।

এছাড়াও ফারদিনের স্বপ্ন ভাঙ্গার গল্প এ্যালবামে সুখের পরশ গানে মডেল হয়েছিলাম। গানটির পরিচালক ও মডেল ইহতেশাম জনি। পরিচালক
ইহতেশাম জনির সঙ্গে আমার নাটকে কাজ করার কথা চলছে। আশা করি নাটকটি আপনাদের ভালো লাগবে। ছোটবেলা থেকেই চিত্রাঙ্কনের পাশাপাশি অভিনয়কে বেশ গুরুত্ব দিয়ে আসছিলাম বলেই আজও আমি অভিনয় করি ছবি আঁকি। স্কুল জীবনে কিছুটা সময় কবিতা, ছড়া লিখার চর্চা ছিল বলেই সেগুলো আবৃত্তিও করেছি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে।

মিডিয়াতে নাটকের সঙ্গে আছি বলেই প্রানের তাগিদে দু’একটি নাটক লেখার অভ্যাস শুরু করি। যেমন তুমি রবে অমরত্বের সারথী। তবে এটি অবশ্য টেলিফিল্ম এ রূপায়িত করলেই ভাল হবে বলে মনে করি। তরকারি তৌহিদ নামের একটি মজার কমেডি নাটকের জন্য গল্প লিখেছি। যা অনেক পরিচালক নির্মাণ করতে চাচ্ছেন। আবার বদঅভ্যাস নাটক লিখেছি। পরিচালক শিমুল সরকার আমার একটি নাটক নির্মাণের পরিকল্পনার কাজে ব্যস্ত আছেন। তাছাড়াও আশিক উল আলম বদঅভ্যাস নির্মাণ করতে আশা পোষণ করেছেন। আমার নাট্যগুরু নাট্যকার ও পরিচালক শিমুল সরকার আমাকে বলেছেন আমার লেখা নাটকে মূল চরিত্রে অভিনয় করাবেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডিতে পা দিয়েই থিয়েটার চর্চায় মনোনিবেশ করেছিলাম। নাট্যচর্চায় বিভিন্ন ভাবে ব্যস্ত থাকা মানুষ ছিলাম বলেই আজও অভিনয়কে জীবনের রসে ভাসিয়ে দিতে চাইছি। আমি দেখিয়েও দিয়েছি মিডিয়া নাটক, ডকুমেন্টারী এবং মিউজিক ভিডিওতে অহরহ কাজ করে। চ্যানেলে প্রথম প্রচারিত কথা জানতে চাইলে প্রথমে উঠে আসে, চ্যানেল আই’য়ে আমার অভিনিত নাটক ২০০৫ সালে প্রথম প্রচার হয়েছিল। নাটকের নাম এবং একজন নারী। আরো অভিনয়ে ছিলেন ডিএ তায়েব, তানিয়া আহম্মেদ, চিত্রনায়িকা কাজল আরো অনেকে। তার পরপরই শিমুল সরকারের ডাইরেকটর, চোরকাব্য, শাস্তি, সাহস সঞ্চয় ব্যুরো, এরং মামার হাতের মোয়া ইত্যাদি।

মঞ্চ নাটক ও পথ নাটকে অনেক অনেক অভিনয় করেছি প্রায় সবগুলোর পরিচালনায় ছিলেন আজকের মিডিয়া পরিচালক ও নাট্যকার শিমুল সরকার। উল্লেখ্য যে উৎপল দত্তের ‘রাইফেল’ নাটকে রহমত চরিত্রে পরিচালক শিমুল সরকার আমাকে দিয়ে অভিনয় করিয়ে ছিলেন। অনেক কষ্টসাধ্য এই চরিত্রে তিনি আমাকে তোলে ধরতে বেশ কষ্ট করেছিলেন। তারা শংঙ্কর বঙ্গ্যোপাধ্যায়ে উপন্যাসকে নাট্যরুপ করেছিলেন সাইমুন জাকারিয়া পরিচালনা করেছিলেন শিমুল সরকার সেখানেও কাজ করছি। শিমুল সময়োপযোগি ইমপ্রোভাইজেশন প্রডাকশন তৈরী করে আমাকে দিয়ে খুব সহজেই অভিনয় করিয়েছেন। যেমন: রোদের আধার, সিগনাল আনলিমিটেড ওয়ান, ও সিগনাল আনলিমিটেড টু ইত্যাদি।

পরিচালক শিমুল ভাই নির্দেশনা দিয়েছেন ফুটপাত, পাগলা গারদ, দাও ফিরে সে অরন্য, বাঁশ, হয়তো নয়তো, বোবা, যায় দিন ফাগুনো দিন, মে দিবস, জরিমন, ইতিহাসের পাতা থেকে, একটি অবাস্তব গল্প, মড়া, অতৃপ্ত আত্মা, হোল্লাবোল প্রভৃতি নাটকে আমি অভিনয় করেছি। তাছাড়া অন্য পরিচালকের কাছে নাটকের অভিনয় করেছি। যেমন: কবর, জীবন নদীর তীরে, ফাইনাল বিয়ে, বহমান, ক্ষ্যাপা পাগলের প্যাচাল, চক্রব্যূহ, ফিরে আসবে ইত্যাদি।

রাজশাহীতে অবস্থানের কারণে রাজশাহীর স্থানীয় নাট্য কর্মীদের সঙ্গে আড্ডা দেয়া পড়ে আমার প্রতিনিয়ত। তাদের সঙ্গেও নাটকের আলাপ আলোচনা হয় এবং দু’একটি ভিডিও এবং মঞ্চ নাটকে অভনয় করেছি। যেমন: ভন্ড উপ্যাখান, ভাগ্যের পরিহাস, উপেক্ষিত রিক্সাওয়ালা। পরিচালক শিমুল সরকার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বপ্রথম এ্যাবষ্টাকধর্মী নাটক নাট্যদুয়ার সংগঠনে চালু করেছিলেন বলে সেখানে আমি অভিনয় করেছি। সেসব নাটকে পরিচালক শিমুল সরকার পুরো স্ক্রিপটে কি ঘটবে তা মুল এ্যাকশান গুলো নাটকের শুরুতে করিওগ্রাফিতে ফুটিয়ে তুলেছেন। জীবনের শ্রেষ্ট করিওগ্রাফি উৎপল দত্তের রাইফেল নাটকে করেছি এবং তা মজা করে উপভোগ করেছি।

এবার আসি আসল কথায়, নাটক করতে হলে নাটক পড়তে হয় এবং অনেক নাটক দেখতে হয়। মঞ্চ নাটক করতে হয়। যা আমি শিখেছি পরিচালক শিমুলের কাছ থেকে। তাই আজও তাঁর পথ অনুসরণ করে যাচ্ছি। বাংলাদেশ-ভারত নাট্য পরিচালক ও লেখকদের অনেক অনেক বই সংগ্রহে রেখেছি, সময় পেলে পাতা উল্টানোর চেষ্টা করি।

শাহারিয়ার চয়নের সাড়া জাগানো টি- ২০ বিশ্বকাপ এর বাতিক্রমধর্মী এবং আকর্ষনীয় ভিডিওতে ২০১৪ সালের ২৭ মার্চে আমি অভিনয় করেছি। আবার কন্ঠশিল্পী সোহেল এসকে ও রুলিয়া সুলতানার যৌথ মিউজিক্যাল ফিল্ম ‘হারিয়ে তোমায়’ এতে মডেল হয়েছি ড্রিম মেকিং প্রোডাকশনের ব্যানারে। মিউজিক্যাল ফিল্মটি পরিচালনা করেছিলো শাহারিয়ার চয়ন। পরিচালক বসন্ত বাশার এর চারুকলা বিভাগের প্রাচ্যকলা গ্রুপের ‘ওয়াশ পেইন্টিং’ নিয়ে একটি ডকুমেন্টরীতে সাক্ষাতকার দিয়েছি। যা বিটিভি চ্যানেলে প্রচার হয়েছে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ৬ তারিখে রাত ১০টা ৫০মিনিটে।

ছোট থেকেই নাটক ভালো লাগতো আমার। নাটক থিয়েটার দেখতাম। যাত্রায় কাজও করতে ইচ্ছে হতো। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পড়তে নাটকের প্রতি ভালো লাগা অনেক বেড়ে যায়, সেই ছোট বেলার আশা আকাংখার যাত্রা পালার পাঠ গাওয়া আর তেমন ভাবে করা হয়ে উঠেনি। তবে যে যাত্রা করিনি তা নয়, প্রতি বছরে পুঁজা পার্বণে, ছাব্বিশে মার্চে, শোলই ডিসেম্বরে গ্রামের স্কুলে ও হিন্দু বাড়িতে অনেক যাত্রার পাঠ গেয়েছি। তবে পূর্নাঙ্গভাবে চর্চা তখন জানা শুনার পরিশেব ছিল না। সেগুলো চর্চা এখন জীবনকে অনেক আনন্দ দেয়। যেমন: আবির ছড়ানো মোর্শিদাবাদ, অনুসন্ধান, এই পৃথিবী টাকার গোলাম, সাঁখা দিওনা ভেঙ্গে, জেল থেকে বলছি, লোহার জাল, মন্দির থেকে মসজিদ, গরীবের ছেলে, প্রেমের সমাধি তীরে ইত্যাদি।

খ্যাতনামা নাট্য পরিচালক শিমুল সরকার সম্পর্কে আমার অনেক স্মৃতি আছে, ধারাবাহিক নাটক ডাইরেক্টরে আমি ঈদ্রিস খলিফা ছিলাম। আমার একটি শর্টকাট টেইলার্স ছিল। কিন্তু মেম্বারের বউয়ের ব্লাউজ এমনি ছোট করে বানিয়েছিলাম তা মেম্বারের বউ পরতেই পারছিলেন না। মেম্বারের বউতো ব্লাউজ হাতে পেয়ে দেখে আমাকে শাস্তির ব্যবস্হা করলেন। ডেকে নিয়ে বাড়ির পাশে ডাব গাছের গোড়ায় বাঁধলেন। চোখ উপড়িয়ে নেয়া হবে। আমার এই গল্প বলার উদ্দেশ্য পরিচালক শিমুল সরকার আমাকে চরিত্রে পরিপূর্ণ রুপায়নে সকাল থেকে ডাব গাছের গোড়ায় বেঁধে রাখলেন। আর একটি গান দিলেন গাইতে। গানটি হচ্ছে ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দেরে…ফাঁদ পাইতাছে ফাদিয়াল ভায়া পুঁটির মাছও দিয়া…ওরে পুটির মাছও দিয়া…ওরে সেই না মাছের জন্যেরে বগা পড়ে উঠাল দিয়া রে…। ঠিক এমন গানটি গাইতে থাকি সকাল থেকে দুপুরের কাঠফাটা রোদের মধ্যে, আর আমার নাট্যগুরু পরিচালক শিমুল সরকার অন্য অনেক শুটিং স্পটে শুটিং করছেন। পরিচালক ভালো করেই জানতে এটা তোফা ভাই। আমি যা বলবো একরক্তিও এদিক ওদিক হবেনা। ঠিক আমিও যথাযত ভাবে চরিত্রে ডুবে থাকার মানুষ ছিলাম। এমন স্মৃতিকি কখনো ফিরে আসবে। কিযে বাস্তর অভিনয়,ক্যারানি গঞ্জের মানুষ আমাকে বলেছিলেন। আপনি কলেজ শিক্ষক, এমন কষ্টের অভিনয় ক্যান নিয়েছেন। আমি বলেছিলাম, আপনাদের ভালো লেগেছে। উনারা অনেকেই বলেছিলেন, শুধুই ভালো লাগা, আমাদেরকে কাঁদিয়েও ছাড়লেন। আমাদের জীবনের সঙ্গে মিশে আপনি অভিনয় করলেন। আমার তখন মনে হয়েছিল আমি সার্থক টেলিভিশনের দর্শক তো ইনারাই হবেন। সে সময় আমার মোবাইল নম্বারও অনেকে নিয়েছিলেন। টেলিভিশনে নাটক প্রচারিত হবার পরেই তাঁরা আমাকে কল করেছে। আমাকে এধরণের চরিত্র দেবার জন্য গুরু শিমুল সরকারের কাছে চিরকতৃজ্ঞ। ইউনিটে আমি খেয়েছি কিনা। মন খারাপ কেন। এমন অনেক বিষয়ে পরিচালক শিমুল সরকার আমাকে নিয়ে দেখা শুনা করেছেন।আমি মনে করি, মা-বাবার পরেই শিমুল সরকার হলেন আমার নাট্য জগতের পথপ্রদর্শক।

পেশাজীবনে ছাত্র পড়াই, কিন্তু আমার ধ্যানজ্ঞানে নাটকই সবসময় বিরাজমান। আমার বাবার নাম মোঃ কমর উদ্দীন শাহানা, মাতা, মোছাঃ মনোয়ারা বেগম। পেশায় আমি কলেজ শিক্ষক, অভিনেতা, সাংবাদিক, স্ক্রিপ রাইটার এবং চিত্রশিল্পী । নওগাঁ জেলার মান্দা উপজেলার আত্রাই নদীর পার্শ্বে পাঁজর ভাঙ্গা গ্রামে আমার জন্ম। আমার স্কুল জীবন নিজ গ্রামেই, হাইস্কুল জীবন চকউলী বহুমূখী উচ্চবিদ্যালয়ে। তারপর গ্রামবাসী, আত্মীয়-স্বজন এবং স্কুল শিক্ষকের উৎসাহে আর্ট কলেজে পড়ার আগ্রহ জন্ম নেয় আমার। আমি চলে আসি রাজশাহীতে, ইউনিভার্সিটির পাশ্বেই ছিল চারুকলা মহাবিদ্যালয়। পরে মহাবিদ্যালয়টিকে আমরাই আন্দোলন করে ইউনিভার্সিটিতে আত্মীকরণ করি। সেখান থেকে বি,এফ,এ এবং এম, এফ, এ পাস করি। এখন চাকরীর সুবাদে রাজশাহী চারুকলা মহাবিদ্যালয়ে কম্পিউটার গ্রাফিক্স বিষয়ের শিক্ষক। বর্তমান নিবাস রাজশাহী মহানগরীর বর্নালীর মোড়ের পিছনে হেতেম খাঁস্থ গ্রীন গার্ডেন টেকনিক্যাল এন্ড বিএম কলেজের পার্শ্বে।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন

নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

আরও অন্যান্য সংবাদ


টুইটর




Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com