,

মেঘনার ভাঙনে, ভাঙছে হৃদয়

কিশোর কুমার দত্ত, লক্ষ্মীপুর: মেঘনা নদীর তীরবর্তী ভাঙন কবলিত জেলাগুলোর মধ্যে লক্ষ্মীপুরের রামগতি ও কমলনগর উপজেলার কিছু কিছু এলাকাও রয়েছে। যে নদী দেশের কথা মনে করায়, স্বজনের কথা মনে করায়, বিশাল উদাত্ত জলরাশি আর খোলা আকাশ মনে মায়ার জন্ম দেয়। নদী আমাদের দেশ ও মানুষের মায়ার জননী। তারপরও নদী আমাদের সব কিছু নিয়েই চলেছে। কিন্তু সেখানে এখন আর তেমন কিছুই নেই। সেই জায়গাটিতে শুধু রয়েছে স্মৃতি। বহু স্মৃতি হারিয়ে গেছে নদী গর্বে। যাদের আর কিছুই বাকি রহিলনা। ঠাইও নাই তাদের। আজ সেই সর্বহারা মানুষগুলোর আছে শুধু হাও-মাও কান্না।

বিশ্বের মানচিত্রে যে দিন বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে ঠিক সেদিনই বাংলার মানচিত্রে জন্ম হয়েছে লক্ষ্মীপুরে রামগতিরও। আর রামগতি থেকে ভাগ হয়ে হয় আরো একটি ক্ষুদ্রতম উপজেলা কমলনগর । এই উপজেলায় আছে কলেজ, মাদ্রাসা, স্কুল ও উচ্চ শিক্ষার বিদ্যাপিট। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে লেখাপড়া করে গিয়ে যাঁরা বাংলাদেশ পরিচালনা করতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে তাঁদেরি মাতৃভূমি রামগতি ও কমলনগর আজ মেঘনার করাল গ্রাসে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। হাজার হাজার মানুষ সবকিছু হারিয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে খোলা আকাশের নিছে মানবেতর জীবন যাপন করছে। বহু যুগ যুগ ধরে গড়ে ওঠা সামাজিক কাঠামো কাঁচের টুকরোর মত ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। কয়েকশ’ একর জমির মালিক আজ বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছে। এক সময়ের বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানের জন্য যারা বিপুল পরিমাণ জমি দান করেছেন, এখন তারা অন্যের জমিতে ঠাঁই নেয়। বিটেমাটি হারানোর সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছে জীবনের গতিপথও। আর এ জীবিকার অবলম্বন থেকে পারিবারিক ঐতিহ্য, এমনকি সামাজিক কাঠামো অথবা শিশু-কিশোরদের লেখাপড়া পর্যন্ত।

সূত্র জানান, মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে লক্ষীপুরের মেঘনাতীরের উপজেলা কমলনগর এভাবেই বদলে যাচ্ছে। কোথাও ভাঙনের গতি কিছুটা কমলে আবার কোথাও বেড়ে যায় অস্বাভাবিকভাবে। এসব এলাকার বহু ঐতিহ্যবাহী পরিবারের পুরানো ভিটে এখন মেঘনার বুকে। বাপ-দাদার শত শত এক জমি থাকলেও এখন তারা পথে বসেছে। পূর্বপুরুষের বিপুল সম্পত্তির মালিকানা এখন তাদের কাছে শুধুই ইতিহাস। মেঘনা শুধু তাদের বিটেমাটি ভাঙছেনা, ভাঙছে তাদের হ্দৃয়।

উপজেলার মতিরহাট থেকে চরফলকন পর্যন্ত নদীপথ ঘুরে দেখা গেছে, শুধু ধ্বংসের চিত্র। মেঘনা নদীর প্রতিনিয়ত ভাঙ্গনে হেলে পড়েছে গাছপালা, ফসলী জমি ও বাড়িঘর। উপকূলীয় মেঘনার পাড়ের সর্বস্ব হারানো মানুষের শোকের মাতম। লক্ষীপুরের ক্ষুদ্রতম উপজেলা এই কমলনগর এর আগেও তিনবার ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। এবার নিয়ে চতুর্থবারের মতো ভাঙছে এই জনপদ। ভাঙনের পর মেঘনা অববাহিকায় পলি জমে আবার মাথা তোলে ভূক্ষ। স্বপ্ন জাগায় মানুষের মনে। চর ফলকন ইউনিয়ন আর পাটোয়ারিহাট ইউনিয়নের সীমায় ঐতিহ্যবাহী লুধুয়া বাজার। বেশ জমজমাট বাজার ছিলো। পাশে মাছ ঘাটের কারণে এ বাজার জেগে থাকতো রাত-দিন। কিন্তু এ বাজার এখন আর নেই।  

লুধুয়া বাজার রক্ষা নিয়ে এখন যে শঙ্কা ছিলো, সেই শঙ্কাই ছিল বাতির খাল, কিংবা সাহেবের হাট নিয়ে। ওইসব বাজারের শেষ রক্ষা হয়নি। কোনোটি একেবারেই নি:শেষ হয়ে গেছে। আবার কোনোটি পিছু হটতে হটতে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। মানে স্থান বদলের আর কোনো জায়গা নেই।

কমলনগর উপজেলার পাটোওয়ারীর হাট, লুধুয়া, চরফলকন ও চরজগবন্ধুসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এমন বহু চিত্র পাওয়া যায়। স্থানীয় লোকজন জানালেন, ভাঙনের প্রভাব পড়েছে তাদের জীবনের সব ক্ষেত্রে। জীবিকার ধরন বদলে গেছে। নদী-নির্ভর জীবিকার কারণে অনেকেই নদীর কিনারে থাকতে চান। কেউ পারেন। আবার কেউ পারেন না। ফলে জীবিকার প্রয়োজনে পরিবারের সব সদস্যদের নিয়ে তাদের ছুটতে হয় শহরে। গত কয়েক বছরে এ উপজেলা থেকে স্থানান্তর হওয়া মানুষের সংখ্যাও অনেক বেড়েছে।

সরেজমিনে পাওয়া তথ্যসূত্র বলছে, ভাঙনের প্রভাব পড়ছে শিক্ষা ব্যবস্থায়ও। পরিবার স্থানান্তরিত হওয়ায় বহু ছেলে-মেয়ে লেখাপড়া ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। অনেকে আবার একই ক্লাসে ২-৩ বছর থেকে লেখাপড়ায় অগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। লুধুয়া ফলকন ফয়জুন্নাহার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এমন বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীর দেখা মেলে। ফলকন, কালকিনি, সাহেবেরহাটে পথে যেতে দেখা হয় এমন আরও কয়েকজন শিশু-কিশোরের সঙ্গে।

আরো সূত্র জানা যায়, মেঘনার বুকে জেগে ওঠা চর এই অঞ্ছলের বয়স প্রায় দেড়শ’ বছর। এখানকার জনবসতি প্রায় একশ’ বছরের। পুরোনো ভোলার শাহবাজপুর, রামদাসপুর, নেয়ামতপুর, নোয়াখালীর কুশখোলা, ফরাশগঞ্জ, ভুলুয়া ও হাতিয়া এলাকা থেকে জনবসতি গড়ে তোলে এই এলাকা গুলোতে। বংশ পরম্পরায় শত বছরে এ বিস্ততি ঘটে গোটা কমলনগর জুড়ে। কিন্তু এখন তা ভাঙনের মুখে। বছরে বছরে এই জনপদ ছোট হয়ে আসছে, আর এখানকার মানুষের ছুটছেন এদিক ওদিক।

লুধুয়া বাজারের ব্যবসায়ী মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, মেঘনার ভয়াবহ ভাঙনের মুখে পড়ে শত বছরের পুরোনো এ বাজারটি ইতোমধ্যে বাজারটা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। বিলীন হয়ে গেছে ওই বাজারের শত বছরের পুরোনো জামে মসজিদটি ও চর ফলকন উচ্চ বিদ্যালয়টি। নদীভাঙনের প্রভাব সবচেয়ে বেশী পড়ে উপকূলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে। বিদ্যালয় জায়গা স্থানান্তরিত  হলে ঝরে পড়ে অনেক শিক্ষার্থী।

কথা হয় চর আলেকজান্ডার গ্রামের কৃষক আবু ইউসুফের সঙ্গে, ভাঙনের মুখে পড়া বসতভিটাটি অন্যত্র সরিয়ে নিতে খুবই ব্যস্ত তিনি। ঘর-দরজা নিয়ে কোন এলাকায় যাবেন? এ প্রশ্ন করলে হাও-মাও করে কেঁদে ওঠেন তিনি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমগো এখন যাওয়ার কুনু জাইগা নাই, কই যামু জানিনা, আমাগো ফটু তুইল্যা কি হইবো? কতজনে ফটু তুইল্যা নিলো কিন্তু আমগো ভাইগ্যের কিসু হইলো না”indexসূত্রমতে, মেঘনার ভাঙন রোধে সরকার ইতোমধ্যে এক কোটি ৯৮ লাখ টাকা বরাদ্দ দিলেও কাজ হয়েছে রামগতি উপজেলা শহরের আলেকজান্ডার এলাকায়। কিন্তু এ প্রকল্পের মধ্যে কমলনগর উপজেলায় এক কিলোমিটার কাজ করার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত সে ব্যাপারে কার্যকর কোনো ভূমিকা নেয়া হয়নি। এ কারণে নদী ভাঙনের তীব্রতা দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে। ভাঙন রোধে সরকার দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে লক্ষ্মীপুরের মানচিত্র থেকে কমলনগর উপজেলা হারিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।

উপজেলার পাটারীরহাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট একেএম নুরুল আমিন জানান, গত একমাসে তার ইউনিয়নের শতাদিক পরিবারের বসতভিটা মেঘনা গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এভাবে প্রতিনিয়তই মেঘনার ভাঙন চলছে। ভাঙনরোধে কাজ শুরু করার জন্য তারা দীর্ঘদিন ধরে জোর দাবি করে আসছেন।

লক্ষ্মীপুর-৪ রামগতি-কমলনগর আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল্যা আল-মামুন জানান, মেঘনা নদীর ভায়াবহ ভাঙন থেকে কমলনগর উপজেলাকে রক্ষায় ‘কমলনগর-রামগতি মেঘনার তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের’ আওতায় একনেকে ১৯৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ওই প্রকল্পের আওতায় রামগতির আলেকজান্ডারে বাঁধ নির্মাণের কাজ চলছে। খুব শিগগিরই কমলনগর উপজেলায়ও বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হবে।

লক্ষ্মীপুরের জেলা প্রশাসক মোঃ জিল্লুর রহমান চৌধুরী জানান, রামগতি ও কমলনগর উপজেলাকে মেঘনা নদীর ভাঙন থেকে রক্ষায় সাড়ে ৬শ কোটি টাকার প্রয়োজন। ইতোমধ্যে রামগতি উপজেলাকে রক্ষায় সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধায়নে প্রায় ২শ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে চলছে বাঁধ নির্মাণ কাজ। তবে প্রয়োজনীয় বরাদ্দের অভাবে কমলনগর উপজেলাকে নদী ভাঙ্গণ থেকে রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া যাচ্ছে না। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। বরাদ্দ পেলে নদী ভাঙন রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হবে।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন

নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

আরও অন্যান্য সংবাদ


Udoy Samaj

টুইটর




Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com