,

আজ আজ আজ ।। কবীর সুমন

মালেগাঁও বিস্ফোরণের তদন্ত করতে গিয়ে মহারাষ্ট্র ATS প্রধান, আই পি এস অফিসার হেমন্ত করকরে যখন অভিনব ভারতনামে এক উগ্রবাদী হিন্দু দলের ১১ জনকে গ্রেপ্তার করেন, নরেন্দ্র মোদী তাঁকে “দেশদ্রোহী” বলেছিল (সচেতনভাবে বলেছিলেনলিখলাম না, তাহলে এডলফ হিটলার সম্পর্কেও লিখতে হয় হিটলার ৬০ লক্ষ ইহুদি নিধন করেছিলেন‘)

পরে, হেমন্ত করকরে তাঁর দুই সহযোগী অফিসার সমেত খুন হবার পর নরেন্দ্র মোদী, জেনেছি, হেমন্ত করকরের স্ত্রীকে বিস্তর টাকা দিয়ে কিনে নিতে চেয়েছিল। বেচারা নরেন্দ্র।

১৯৪৭ সালের পর হেমন্ত করকরের তদন্ত ও তৎপরতার মধ্য দিয়েই প্রথম প্রকাশ্যে জানানো হয় যে হিন্দু উগ্রপন্থীরাই সন্ত্রাসের মূলে। সচরাচর কোথাও একটা “সন্ত্রাসমূলক” কিছু হলে ভারতে প্রথমেই এক ধার থেকে মুসলমানদের গ্রেপ্তার করা হয়। বাবরি মসজিদ ভাঙার পর থেকে নানান সময়ে “সন্ত্রাসমূলক” বিস্ফোরণ, হামলা হয়েছে। প্রায় প্রত্যেকটার জন্যই উগ্রবাদী হিন্দুরা দায়ি, কিন্তু শয় শয় মুসলমান গ্রেপ্তার হয়েছেন, যাঁদের অনেকে আজও বিনা বিচারে জেলে পচছেন। তাঁদের অনেকেই এত গরীব যে আদালতে মামলাও লড়তে পারেন না তাঁদের পরিবার। ভারতের আদিবাসীদের অবস্থাও এই গরীব শ্রেণীর মুসলমানদের মতো।

মালেগাঁও বিস্ফোরণের তদন্তের সূত্রে ১১জন (বিজেপি-আর এস এসের মতে দেশপ্রেমী‘) হিন্দু সন্ত্রাসবাদী গ্রেপ্তার হবার পর আর ঐ ধরণের বিস্ফোরণ হয়নি। কিন্তু তার আগে একের পর এক বিস্ফোরণের পর থেকেই অসংখ্য “সন্দেহভাজন” মুসলমানকে গ্রেপ্তার করে জেলে আটকে রাখা সত্ত্বেও বিস্ফোরণ হামলা কিন্তু থামেনি।

হেমন্ত করকরে সেকুলার ভারত বা ভারতের সেকিউলারিজম ও আইনি-শাসনের নীতির নিশান। তাঁর মতো অকৃত্রিম বন্ধু ভারতের মুসলমানরা কখনও পেয়েছেণ কী? হেমন্ত করকরে কিন্তু একজন পুলিশ অফিসার হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালন করে গেছেন – নিজেকে “বীর” প্রমাণ করার জন্য বা “Champion of the Muslims”হিসেবে নিজেকে জাহির করার জন্য তিনি কিছু করেননি । জীবনের শেষ দিকে তিনি পরিচিতদের কাছে বলতেন – তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে তিনি চিন্তিত। মৃত্যুর অল্প কিছুদিন আগে বাড়ির পেছনের পাঁআচিলটা একটু উঁচু করিয়ে নিয়েছিলেন তিনি।

সব দিক বিবেচনা করলে অতি নিরেট মগজওলা মানুষও বুঝবে যে হেমন্ত করকরেকে সুপরিকল্পিতভাবে একটি জাতীয় সংকটের মুহূর্তে খুন করা হয়েছিল। নয়তো – তাঁর বুলেটপ্রুফ ভেস্টটা নিয়ে বিতর্ক দেখা দিত না। যদি তিনি ভেস্টটা পরে বেরিয়ে থাকেন তো হানাদারদের তিনটি বুলেটই তাঁর বুকে লাগল কী করে? কয়েকবার গাড়ি পাল্টেছিলেন ATS প্রধান। পাকিস্তানী হানাদাররা জানল কী করে কোন্গাড়ি থেকে হেমন্ত করকরে নামছেন? আরও অনেক ব্যাপার আছে, অনেক প্রশ্ন আছে যার উত্তর পাওয়া যায়নি। ভারতের একটা রাজনৈতিক দলও আসলে চায়নি হেমন্ত করকরের খুনের সঠিক তদন্ত হোক, তাঁর খুনীদের ধরা হোক, সাজা হোক। – দিল্লিতে লোকসভার সদস্য থাকাকালে নানান দলের সাংসদদের সঙ্গে আমার আলাপ ও বন্ধুতা হয়। হেমন্ত করকরে প্রসঙ্গ তুলে দেখেছি সবাই কেমন মুখ নিচু করে ফেলেন বা অন্যদিকে তাকিয়ে প্রসঙ্গটা ঘোরান,কেউ বা হাঁ করে তাকিয়ে থাকেন ও মাথা নাড়েন গম্ভীর মুখে। – অনেক সাংসদ তো জানেনই না তাঁর নাম। এই রাজ্যের অনেক বিপ্লবী, ফেসবুক লেসবুক বিপ্লবী, মমতাবিরোধী-বিক্ষুব্ধমানবাত্মা, চির-অতৃপ্ত-হাহাকারবাদী-কথায়কথায় এই অমুক-উপত্যকা আমার নয়কাব্য আওড়ানো অগ্নি-সন্তান কি কখনও হেমন্ত করকেরর কথা ভেবেছেন? ভেবেছেন তাঁর অবদানের কথা? ভেবেছেন – তাঁর স্মরণে একটি দিন পালিত হওয়া দরকার? –কিছু করেছেন কি সে-ব্যাপারে?

আমার গর্ব – আমাদের রাজ্যের কয়েকজন নবীন, তাঁদের মধ্যে মুসলমান নামধারীও আছেন হিন্দু নামধারীও আছেন, নিজেদের উদ্যোগে, কোনও রাজনৈতিক দল বা সমিতির সাহায্য না নিয়ে হেমন্ত করকরে দিবসপালন করছেন আজ। ভারতে এই প্রথম।

ভারতে এই প্রথম।

আজ দুপুর দুটো থেকে কলকাতার শেক্সপিয়র সরণীর ভারতীয় ভাষা পরিষদ হলে ভারতে প্রথম হেমন্ত করকরে দিবসপালিত হবে। এই রাজ্যের এক প্রবীণ নাগরিক হিসেবে আমি গর্বিত। নবীন সহনাগরিকদের চেষ্টায় ও ভালোবাসায় সম্ভব হচ্ছে এই উদ্যোগ। আমি গর্বিত। যে দেশে হেমন্ত করকরে জন্মান সেই দেশেই তো এমন ছেলেমেয়ে জন্মাবেন।

******

 কবীর সুমন, ২৬ নভেম্বর ২০১৫

ফেসবুক থেকে মতামত দিন

নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

আরও অন্যান্য সংবাদ


টুইটর




Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com