,

প্যারিসে ভয়াবহ হামলা: বিশ্ব পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নিচ্ছে?

আনোয়ারুল হক # সপ্তাহখানেক পূর্বে ইউরোপের অন্যতম প্রভাবশালী এবং শিল্প-সাহিত্য সমৃদ্ধ দেশ ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে বেশ কয়েকটি ভয়াবহ হামলায় বহু নীরিহ মানুষ হতাহত হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম দেশটির অভ্যন্তরে ভয়ানক পরিস্থিতির শিকার হতে হয়েছে জনগণকে। অবশেষে সরকার জরুরি অবস্থা জারির মাধ্যমে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারসহ দেশটির অভ্যন্তরে সন্ত্রাসীদের ধরতে চিরুনী অভিযান শুরু করেছে। শতাধিক মানুষ হতাহতের ঘটনায় বিশ্বের প্রতিটি দেশ ফ্রান্সের জনগণকে সমবেদনা জানিয়েছে। 

 

ফ্রান্সের বিশ্বস্ত বন্ধু আমেরিকা, পশ্চিমা বিশ্ব এবং মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ তাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা ছাড়াও সন্দেহভাজন লোকজনের উপর সতর্ক দৃষ্টি রাখছে। ঘটনার জন্য দায়েশকে (আইএসআইএল) দায়ী করেছে ফ্রান্সসহ পশ্চিমা বিশ্ব। নিজ দেশে এমন ভয়াবহ ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওঁলাদ আইএসআইএল নির্মূলে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের দারস্থ হন। জবাবে পুতিনও ফ্রান্স সরকারকে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদানের আশ্বাস দেন।

 

আতঙ্কে মুসলমানরা

প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলার পর পরই যথারীতি ইউরোপের কয়েকটি দেশে মসজিদসহ বিভিন্ন স্থাপনা উপর হামলা পরিচালিত হয়েছে। কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, পর্তুগাল ও স্পেনে মসজিদে অগ্নিসংযোগ করা করা। শুধুমাত্র ফ্রান্সেই ১১৬টি স্থানে মুসলমানদের উপর হামলার খবর পাওয়া গেছে। প্যারিস ঘটনাকে কেন্দ্র করে উগ্র ডানপর্ন্থীদের হিংসাত্মক তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় সমগ্র ইউরোপজুড়ে মুসলমানদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। যেটা নাইন ইলেভেনের সময় বিশ্বব্যাপী পরিলক্ষিত হয়েছিল।

 

ফ্রান্সে সন্ত্রাসী হামলার কারণ

আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সামরিক বিশেষজ্ঞ এবং পশ্চিমা বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার বরাত দিয়ে প্রচার মাধ্যমগুলো যেসব তথ্য সরবরাহ করছে তার মধ্যে তিনটি বিষয়কে আমি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি।

 

(১) আমেরিকার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আইএসআইএল প্রতিষ্ঠায় ফ্রান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। গণমাধ্যমে এসব বিষয় ফাঁস হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের ইমেজ রক্ষাকল্পে ইদানিং আইএসআইএল ইস্যুতে ফ্রান্সের ভূমিকার কিছুটা পরিবর্তন ঘটে। সিরিয়ায় আইএসআইএল অবস্থানে ফ্রান্সের বিমান হামলা একটি কারণ হতে পারে।

 

(২) সিরিয়ায় বিদ্রোহীদের অবস্থানে রাশিয়ার বিমান হামলায় আইএসআইএল’র ৭০% শক্তি ধ্বংস হয়েছে। হামলায় কয়েক হাজার বিদ্রোহী হতাহত হওয়া ছাড়াও বিদ্রোহীদের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিশেষ করে সরবরাহ লাইন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এসময় বিদ্রোহীরা ফ্রান্স ও আমেরিকা থেকে আশাতীত সহযোগিতা না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে প্যারিসে হামলা করতে পারে।

 

(৩) রাশিয়ার ভয়াবহ বিমান হামলার মুখে টিকতে না পেরে সিরিয়া ফ্রন্টে আইএসআইএল অনেকটা কোনঠাসা। প্রাণ বাঁচাতে অনেকে সিরিয়া ত্যাগ করছে। আবার অনেকে মনে করছে যে, আইএসআইএল’র সময় ফুরিয়ে গেছে। তাই বিশ্ববাসীকে নিজেদের সক্ষমতা জানান দিতে আইএসআইএল শেষতক প্যারিসে হামলা পথটি বেছে নিতে পারে।

 

পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নিচ্ছে?

“অন্যের ঘর পুড়তে গেলে যে, নিজের ঘরও আক্রান্ত হয়”-এখন সেটা ফ্রান্স সরকারও হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করছে। অন্য দেশের উপর চাপিয়ে দেয়া হত্যযজ্ঞের করুণ দৃশ্য ফ্রান্সসহ বিশ্ববাসী মিডিয়ার বদৌলতে এতদিন প্রত্যক্ষ করে আসছে। তাই ঘোমটা খুলে ফ্রান্স সরকার ঘটনার জন্য সরাসরি আইএসআইএলকে দায়ী করে সন্ত্রাসী নির্মূলে ‘কোমর বেঁধে’ নামার ঘোষণা দিয়েছে। যেমন কথা তেমন কাজ। সিরিয়া ইস্যুতে রাশিয়ার কঠোর বিরোধী ফ্রান্স সরকার শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহী নিধনে রাশিয়ার সহযোগিতা কামনা করে শেষতক ভ্লাদিমির পুতিনের হাতে হাত মিলিয়ে আইএসআইএল দমনে কাজ করার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছে। এক্ষেত্রে শক্তিশালী মিত্র আমেরিকার সম্মতিকে তোয়াক্কা করছে না ফ্রান্স সরকার। এক কথায় ফ্রান্সের অবস্থা এখন ‘শ্যাম রাখি না কূল রাখি’। তাই রাশিয়ার সহযোগিতা ব্যতীত অন্য কোন পথ খোলা দেখছে না ফ্রান্স। ফ্রান্সের নীরিহ জনগণের রক্তপাত দেশটির ইতিহাসে স্থান পাবে।

 

আইএসআইএল নির্মূলে ফ্রান্সের ভূমিকা কি হতে পারে?

আগেই বলেছি আইএসআইএল প্রতিষ্ঠায় আমেরিকা ও ফ্রান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বলা হয়ে থাকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারী ক্লিনটনের সরাসরি নির্দেশে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে যুবকদের জড়ো করা হয়। এরপর গোয়েন্দা সংস্থার তত্বাবধানে এসব যুককের মগজ ধোলাইপর্ব সম্পন্ন হবার পর সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। পূরো পরিকল্পনায় ফ্রান্সও সরাসরি অংশ নেয়। ইরাক ও সিরিয়ায় আইএসআইএল অস্ত্রশস্ত্র ছাড়াও গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সাহায্য করে দেশ দুইটি। ফলে আইএসআইএল এ ২টি দেশের বিশাল এলাকা দখল করা ছাড়াও তেল সম্পদ লুট করে। ইরাক ও সিরিয়ায় যুদ্ধের সময় ইসরাইল ও তুরস্ক আইএসআইএলকে সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়ে আসছে। কিন্তু প্যারিসে ভয়াবহ হামলার পর খোদ ফ্রান্সের জনগণ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠার আশংকায় দেশটির সরকার এবার নড়েচড়ে বসেছে। সন্ত্রাসী হামলার পরদিন থেকে সিরিয়ায় আইএসআইএল অবস্থানে বিমান হামলা তীব্রতর করে।

 

উল্লেখ্য, গত ১৪ মাস ধরে আইএসআইএল দমনের নামে আমেরিকা ও ফ্রান্স ইরাক-সিরিয়ায় বিদ্রোহীদের অবস্থানে কয়েক হাজার দফা বিমান হামলার কৃতিত্ব জাহির করলেও থলের বিড়াল বেরিয়ে পড়ে কয়েকমাস পূর্বে। ইরাক ও সিরিয়ায় আইএসআইএলকে বিমান থেকে অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহের চিত্রগুলো সাংবাদিকদের দৃষ্টি এড়াতে পারেনি। বিমান থেকে অস্ত্র ফেলার ভিডিও মুহূর্তের মধ্যে বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। অপরদিকে ইরান ও সিরিয়া এতদিন অভিযোগ করে আসছিল যে, আইএসআইএল নির্মূলের নামে পশ্চিমারা সংগঠনটিকে শক্তিশালী করছে। পরবর্তীতে ইরান-সিরিয়ার অভিযোগটি সত্যে পরিণত হয়।

 

বেকায়দায় ফ্রান্স সরকার

আইএসআইএলকে সহায়তার কারণে ফরাসি জনগণের আস্থা হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে হতে পারে সরকারকে। এছাড়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ভাবর্মূতি চরমভাবে ক্ষুন্ন হবার আশংকা রয়েছে। দেশ বিদেশে জটিল পরিস্থিতিতে ফ্রান্স সরকার এখন রাশিয়ার সাথে জোটবদ্ধভাবে সিরিয়ায় আইএস‌আইএল অবস্থানে হামলা তীব্রতর করতে পারে। প্রয়োজন হলে রাশিয়ার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ইরাক ও লিবিয়ায় অভিযান চালাতে পারে। এর ব্যতিক্রম অন্য কোন চিন্তাভাবনা করবে না ফ্রান্স সরকার। এখন শুধু ফ্রান্সই নয়- বরং গোটা ইউরোপ জুড়ে আইএসআইএল আতঙ্ক বিরাজ করছে। পার্শ্ববর্তী দেশ বেলজিয়ামসহ কয়েকটি দেশে আইএসআইএল সদস্যদের খোঁজে তল্লাশী অভিযান শুরু করেছে। সুতরাং ফ্রান্স নিজেদের স্বার্থে এখন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের পাশাপাশি আইএসআইএল নির্মূলে কাজ করবে বলে আমার বিশ্বাস।

 

ইউরোপজুড়ে মুসলমানদের দিনকাল

নাইন ইলেভেনের পর সমগ্র ইউরোপে বসবাসকারী মুসলমানদের উপর হামলা বৃদ্ধি পায়। প্যারিসের ঘটনায় ”আগুনে ঘি ঢালার” পরিস্থিতি বিরাজ করছে। প্যারিসে হামলার পর দেশটিতে বসবাসকারী মুসলমানদের উপর ১১৬টি হামলার খবর পাওয়া গেছে। একটি শরণার্থী শিবিরসহ কয়েকটি মসজিদে অগ্নিসংযোগের ঘটনা বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করেছে। কানাডা, পর্তুগাল, আমেরিকা, বেলজিয়াম, এবং জার্মানিতেও একাধিক সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে। মোদ্দাকথা, নাইন ইলেভেনের কথিত নাটক মঞ্চস্থ করে পশ্চিমারা সূদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করে। যার অংশ হিসেবে আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া এবং সর্বশেষ ইরান আগ্রাসনের মাধ্যমে এসব দেশকে খণ্ডবিখণ্ড করা, মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র পাল্টে দেয়া, মুসলমানদের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টির মাধ্যমে যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত রাখার গোপন তথ্য মিডিয়াগুলো ফাঁস করে দেয়। আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়ায় অপারেশনে মোটামুটি সফল হয় পশ্চিমারা। কিন্তু সিরিয়া যুদ্ধের মাঝপথে এসে সবকিছু ওলট-পালট হয়ে গেছে। মূলতঃ ইরান ও রাশিয়ার ভূমিকায় যুদ্ধের দৃশ্যপট পাল্টে যাচ্ছে। ইউরোপীয়রা মুসলমানদের এখন সন্দেহের তালিকায় বিবেচনা করছে। সমগ্র ইউরোপে মুসলিম হিজাবধারী নারীদের উপর অসংখ্য হামলার ঘটনা ঘটেছে। অপরদিকে পশ্চিমা প্রচার মিডিয়া মুসলমানদের বিরুদ্বে রীতিমত প্রচারণা যুদ্ধে নেমেছে। প্যারিস ঘটনায় সিরিয়ার লাখ লাখ উদ্বাস্তুর ভবিষ্যত এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। জার্মানিসহ ইউরোপের দেশগুলো যখন মানবিক কারণে লাখ লাখ শরনার্থীতে আশ্রয় দিচ্ছে-ঠিক তখন প্যারিসে জঘন্যতম হামলার কারণে সব কিছু ওলট-পালট হবার উপক্রম হয়েছে। অর্থাৎ নাইন ইলেভেনের পর বিশ্বে মুসলমানদের সন্দেহের চোখে দেখছে পশ্চিমারা। পরিস্থিতি আরো কঠোর হলে অবাক হবার কিছুই থাকবে না।

 

রাশিয়ার ভূমিকা

আইএসআইএল দমনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এখন চালকের আসনে। ইউক্রেন ইস্যুতে ভ্লাদিমির পুতিনের নিকট পরাভূত হয় পশ্চিমা বিশ্ব। একক সিদ্ধান্তের অধিকারী পুতিনকে এখন বিশ্বের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের শ্রেষ্ঠ আসনে স্থান করে দিয়েছে খোদ পশ্চিমা মিডিয়াসহ প্রভাবশালী ম্যাগাজিন। সিরিয়া ইস্যুতেও একক দাপট প্রদর্শন করে চলেছে ভ্লাদিমির পুতিন। সিরিয়ায় সাফল্যের পর সন্ত্রাসী নির্মূলে ইরাক, লিবিয়া এমনকি প্রয়োজন হলে ইয়েমেনে অভিযানের ইঙ্গিত দেন শক্তিধর পুতিন। আইএসআইএল ইস্যুতে এতদিন ফ্রান্স রাশিয়ার ঘোর বিরোধী হলেও প্যারিস ঘটনার পর ফ্রঁসোয়া ওঁলাদ পুতিনের দারস্থ হওয়ায় ভ্লাদিমির পুতিনের অবস্থান আরো শক্তিশালী হয়েছে।

 

ইরানের পারমানবিক ইস্যুতে রাশিয়া প্রত্যক্ষভাবে ইরানের পক্ষালম্বন করে। শেষতক বৃহৎ ৬ জাতি গোষ্ঠীর সাথে ইরানের পারমানবিক চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমেও ভ্লাদিমির পুতিন বিশ্বে একক হিরো বনে যান। দক্ষিণ চীন সাগর ইস্যুতে আমেরিকার সাথে চীনের সামরিক সংঘাতের উপক্রম হলেও রাশিয়ার অবস্থানের কারনে শেষতক আমেরিকার যুদ্ধ জাহাজগুলো দক্ষিণ চীন সাগর ত্যাগ করতে শুরু করেছে। অতএব, শুধু আইএসআইএল নয়-বরং বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় ভ্লাদিমির পুতিন এখন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। এতদিন আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমা বিশ্ব অন্য দেশে আগ্রাসনের যে ধারা অব্যাহত রেখেছিল-এবার সেটা অনেকখানি কমে যাবে।#

 

লেখক : আনোয়ারুল হক, সিনিয়র রিপোর্টার এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক

ফেসবুক থেকে মতামত দিন

নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

আরও অন্যান্য সংবাদ


Udoy Samaj

টুইটর




Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com