,

আরিফের ভুল ।। দীপু মাহমুদ

আরিফকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আরিফের মা সফুরা তাকে খুঁজতে বেরিয়েছেন। ইশকুলে যাওয়ার সময় হলেই তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। সফুরা খুঁজে আনেন। আরিফ প্রাইমারি ইশকুলে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। মায়ের খুব ইচ্ছা আরিফ লেখাপড়া শিখে একদিন অনেক বড় হবে। সবাই আরিফকে দেখে ভালো বলবে। আরিফের আব্বার নাম হাসান। তিনি রিকশা চালান। তারও ইচ্ছা আরিফ লেখাপড়া করে একদিন মানুষের মতো মানুষ হবে।

সফুরা বাড়ির পিছনের বাগানে আরিফকে খুঁজে পেয়েছেন। ওখানে একটা গাছের ডালের ফাঁকে ঘুঘুপাখি ডিম পেড়েছে। আরিফ গাছে উঠে দেখতে গেছে ডিম ফুটে বাচ্চা বেরিয়েছে কিনা।

সফুরা কলে পানি তুলে আরিফকে গোসল করালেন। পরিষ্কার জামা-কাপড় পরিয়ে খেতে দিলেন। খেয়েদেয়ে বইখাতা হাতে নিয়ে আরিফ ইশকুলে রওনা হলো। সফুরা বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে ছেলের ইশকুলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে থাকলেন।

বইখাতা হাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আরিফ ইশকুলে যাওয়ার কথা ভুলে গেল। উত্তরের মাঠে তখন বুলেট, খলিল, মতিন ওরা সবাই গরু চড়াতে এসেছে। গরু মাঠে ছেড়ে দিয়ে তারা খেলা করছে। আরিফ ইশকুলে না গিয়ে উত্তরের মাঠে চলে গেল। সেখানে বুলেটদের সাথে ডাংগুলি আর সাতচাড়া খেলা শুরু করল। ইশকুল ছুটির সময় হলে আরিফ বইখাতা হাতে নিয়ে বাড়ি ফিরে এলো। সে প্রতিদিন এই করে। ইশকুলে না গিয়ে মাঠে খেলা করে। কোনোদিন আবার আগে আগে বাড়ি ফিরে আসে। সফুরা জিগ্যেস করেন, কিরে এত তাড়াতাড়ি চলে এলি?

আরিফ সত্য কথা বলে না। সে ভুল কথা বলে। মাকে বানিয়ে বানিয়ে বলে, আজ ইশকুলের স্যাররা সবাই শহরে গেছেন। ইশকুল ছুটি দিয়ে দিল।

সফুরা ছেলের কথা বিশ্বাস করেন। কোনোদিন আবার বাড়ি থেকে বেরিয়ে কিছুক্ষণ পরেই আরিফ বাড়ি ফিরে আসে। মা জিগ্যেস করেন, চলে এলি এত তাড়াতাড়ি?

আরিফ বানিয়ে বানিয়ে বলে, আজ ইশকুল হবে না। হেড স্যার বলে দিয়েছেন।

সফুরা ভাবেন আরিফ প্রতিদিন ইশকুল থেকে পড়াশোনা করে ফেরে। তিনি আরিফকে হাতমুখ ধুইয়ে খেতে দেন। আরিফ খেয়েদেয়ে আবার খেলতে বের হয়ে যায়।

একদিন হেডস্যার আরিফদের বাড়িতে এলেন। আরিফ তখন বাড়িতে ছিল না। বাগানে খেলতে গিয়েছিল। হেডস্যার আরিফের মাকে বললেন, আরিফ তো অনেকদিন ইশকুলে যায় না। কয়েকদিন পর পরীক্ষা। ইশকুলে না গেলে তো সে পরীক্ষায় খারাপ করবে।

হেডস্যারের কথা শুনে সফুরা অনেক কষ্ট পেলেন। হেডস্যার আরিফকে না পেয়ে চলে গেলেন।

সন্ধ্যাবেলা আরিফ বাড়িতে ফিরলে সফুরা তাকে হেডস্যারের কথা বললেন। আরিফ তখন বানিয়ে বানিয়ে বলল, হেডস্যার তো নিজেই ইশকুলে থাকে না। সব সময় শহরে থাকে। আমাকে দেখবে কেমন করে?

সফুরা ভাবলেন আরিফ মনে হয় সত্য কথা বলছে। তিনি চুপ করে থাকলেন।

কিছুদিন পর আরিফদের ইশকুলে প্রথম সাময়িক পরীক্ষা হলো। পরীক্ষার সময় আরিফকে তার আব্বা ইশকুলে দিয়ে আসতেন। আরিফকে সবগুলো পরীক্ষা দিতে হলো। সে নিয়মিত ইশকুলে আসেনি। পড়াশোনা করেনি। তার পরীক্ষা ভালো হলো না।

যেদিন পরীক্ষার ফল বের হবে সেইদিন আরিফ খুব ঘাবড়ে গেল। সে জানে তার পরীক্ষা ভালো হয়নি। পরীক্ষার ফল খুব খারাপ হবে। হেডস্যার এসে নিশ্চয় বাড়িতে তার পরীক্ষার ফল বলে দেবেন। আরিফের ভয় করত লাগল।

সকালে ঘুম থেকে উঠে আরিফ তার মাকে বানিয়ে বানিয়ে বলল, মা, আমি আজ ছোট খালার বাড়িতে যাব। রাতে খালার কাছে থাকব। কাল সকালে চলে আসব।

পাশের গ্রামে আরিফের ছোট খালার বাড়ি। সফুরা ভাবলেন ছেলে যখন তার খালার বাড়িতে যেতে চাচ্ছে, যাক। তিনি আরিফকে গোসল করালেন। নতুন জামাকাপড় পরিয়ে দিলেন। তারপর খাইয়ে-দাইয়ে পাঠিয়ে দিলেন।

আরিফ চলে যাওয়ার পর সফুরা আরিফের আব্বাকে ডেকে বললেন, অনেকদিন বড় বোন যেতে বলেছে। যাওয়া হয় না। চলো আজ বেড়িয়ে আসি।

আরিফের আব্বা হাসান জানতে চাইলেন, আরিফ কোথায়?

সফুরা বললেন, সে গেছে তার ছোট খালার বাড়ি। আগামীকাল ফিরবে।

দুই গ্রাম পরে নদীর ওপারে সফুরার বড় বোনের বাড়ি। কাছাকাছি তিন গ্রামে থাকেন তিন বোন। তবু বাড়ির কাজের চাপে বোনদের বাড়িতে যাওয়া হয় না।

হাসান জিগ্যেস করলেন, বাড়িঘরের কী হবে?

সফুরা বললেন, তালা দিয়ে যাব।

হাসান রাজি হলেন। ওরা আজ নদী পার হয়ে সফুরার বড় বোনের বাড়িতে বেড়াতে যাবেন।

বাড়ি থেকে বের হয়ে আরিফ ভাবল সে আজ ইশকুলে যাবে না। তারপর মনে করল স্যার যদি জানতে চান পরীক্ষার ফল কেন খারাপ হয়েছে, তাহলে বানিয়ে বানিয়ে কিছু একটা বলে দেবে। বলবে, বাড়িতে পড়তে পারেনি তাই পরীক্ষার ফল খারাপ হয়েছে।

আরিফ ইশকুলে গেল। সবাই পরীক্ষার ফল শুনেছে। আরিফ পরীক্ষার ফল শুনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। তার পরীক্ষার ফল হয়েছে ভয়াবহ খারাপ। আরিফ ভেবেছিল স্যার তাকে ভীষণ বকা দেবেন। স্যার বকা দিলেন না। শুধু বললেন, পরীক্ষার ফল বড়ই খারাপ হয়েছে আরিফ। পরীক্ষার ফল ভালো করতে হবে।

আরিফ কিছু বলল না। সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল। তারপর ধীরে ধীরে হেঁটে গিয়ে ইশকুল মাঠের কোনায় গাছের নিচে চুপচাপ বসে থাকল। তার ধারণা হেডস্যার আজ ফেরার পথে তাদের বাড়ি যাবেন। তিনি মাকে সব বলে দেবেন। হেডস্যার কোথায় যান তাই দেখার জন্য আরিফ বসে থাকল।

সকাল গড়িয়ে দুপুর হলো। হেডস্যার ইশকুল থেকে বের হলেন না। দুপুর পেরিয়ে সন্ধ্যা হয়ে এলো। আরিফের ক্ষুধা পেয়েছে। সে কয়েকবার উঠে গিয়ে ইশকুলের টিউবওয়েল থেকে পানি খেয়ে এসেছে। আকাশে কালো মেঘ জমতে শুরু করেছে। মনে হচ্ছে বৃষ্টি হবে।

সন্ধ্যার পর হেডস্যার ইশকুল থেকে বেরুলেন। তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে সাইকেলে উঠে পড়লেন। আরিফ দেখল হেডস্যার সাইকেল চালিয়ে শহরের দিকে যাচ্ছেন। তারমানে তিনি এখন ওদের বাড়িতে যাবেন না। আরিফের মন খুশিতে নেচে উঠল।

ক্ষুধায় আরিফের পেটের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠেছে। তার ভীষণ ক্ষুধা লেগেছে। সে আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। দৌড়ে বাড়িতে চলে গেল। বাড়িতে গিয়ে দেখে দরজায় তালা লাগানো। সেখানে কেউ নেই। আরিফ বুঝে উঠতে পারল না তার আব্বা আর মা কোথায় গেলেন।

সোঁ সোঁ করে বাতাস বইতে শুরু করেছে। গাছের ডালে ডাল বাড়ি খাচ্ছে। গাছের পাতাগুলো এলোমেলো দোল খাচ্ছে। মনে হচ্ছে ঝড় হচ্ছে। আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। কোথাও মড়মড় করে গাছের ডাল ভেঙে পড়ল। আরিফ তাড়াতাড়ি বাড়ির দরজার সাথে পিঠ লাগিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তখন ঝমঝম করে তুমুল জোরে বৃষ্টি শুরু হলো। সেইসাথে ভীষণ ঝড়। ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। আরিফ বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে। সে দরজার সাথে পিঠ ঠেকিয়ে টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অন্ধকারে তার খুব ভয় করছে।

আরিফের মনে হলো সে মাকে বানিয়ে বানিয়ে বলেছিল খালার বাড়িতে যাচ্ছে। তার বানিয়ে বানিয়ে কথা বলার শাস্তি হচ্ছে এখন। ক্ষুধায় আরিফ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। সারাদিন কিছু খাওয়া হয়নি। বাড়িতে এসে খাবে মনে করেছিল। বাড়িতে এসে দেখে কেউ নেই। দরজায় তালা লাগানো। পিপাসায় আরিফের গলা শুকিয়ে গেছে। সে হা করে বৃষ্টির পানি খাওয়ার চেষ্টা করছে।

বৃষ্টির পানি মুখের ভেতর পড়ছে না। চারপাশে ছড়িয়ে যাচ্ছে। আব্বা আর মায়ের জন্য আরিফের কষ্ট হচ্ছে। সে বুঝতে পারছে না, তারা কোথায় গেছেন। আরিফের শীত শীত লাগছে। মনে হচ্ছে জ্বর আসছে। সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। তার দুই পা ঠক ঠক করে কাঁপছে। কাঁপতে কাঁপতে আরিফ দরজা ধরে সড়সড় করে মাটিতে বসে পড়ল।

কিছুক্ষণ পর ঝড়-বৃষ্টি কমে এলো। আরিফ বাড়ির দরজার সামনে জুবুথুবু হয়ে বসে আছে। তার জ্বর চলে এসেছে। সে শীতে কাঁপছে।

বৃষ্টি থেমে এসেছে। হেডস্যার সাইকেল চালিয়ে ওই পথে বাড়ি ফিরছেন। আরিফদের বাড়ির সামনে এসে আবছা আলোতে তিনি আরিফকে দেখলেন। সে দলা পাকিয়ে দরজার সামনে পড়ে আছে। কাছে গিয়ে দেখলেন আরিফের গায়ে অনেক জ্বর। তিনি জিগ্যেস করলেন, তোমার আব্বা-মা কোথায়?

আরিফ কথা বলতে পারল না। তার মুখ দিয়ে গোঁ গোঁ মতো শব্দ বের হলো। হেডস্যার আবার তার আব্বা আর মায়ের কথা জনাতে চাইলেন। এবার আরিফ বলল, আমি জানি না। ইশকুল থেকে ফিরে দেখি বাড়ি তালা দেওয়া।

হেডস্যার অবাক হয়ে বললেন, তোমাকে রেখে তারা চলে গেলেন!

আরিফ তখন সত্য কথা বলল। পরীক্ষার ফল খারাপ হবে জেনে সে যে বানিয়ে বানিয়ে মায়ের কাছে ছোট খালার বাড়িতে যাওয়ার কথা বলেছিল সেই কথা বলল।

সব শুনে হেডস্যার বললেন, তুমি ভালো ছেলে। তুমি সত্য কথা বলেছ। এরপর থেকে নিয়মিত ইশকুলে আসবে। মন দিয়ে পড়াশোনা করবে। আগামীতে দেখবে তোমার পরীক্ষার ফল ভালো হবে।

তখন তিনি আরিফকে সাথে নিয়ে নিজের বাড়িতে গেলেন। ভেজা কাপড় বদলে তাকে শুকনো কাপড় পরতে দিতে হবে। নাহলে জ্বর আরও বাড়বে। আরিফ মনে মনে বলল, আমি আর কোনোদিন বানিয়ে বানিয়ে ভুল কথা বলব না। আমি সব সময় সত্য কথা বলব।

এই কথা ভাবার পর থেকে আরিফের ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে তার জ্বর চলে যাচ্ছে। এখন আর শীত করছে না। সে খুশি মনে হেডস্যারের সাথে স্যারের বাড়িতে গেল।

পরদিন সকালে আরিফের জ্বর ভালো হয়ে গেল। হেডস্যার আরিফের আব্বা আর মায়ের খবর নিয়ে এলেন। আরিফ বাড়ি ফিরে এলো। সে তার মাকে সব কথা খুলে বলল। সব সত্যি বলল। বানিয়ে বলল না।

আরিফ তারপর থেকে আর কখনো বানিয়ে বানিয়ে ভুল কথা বলে না। সব সময় সত্য কথা বলে। সত্য কথা বলার জন্য সবাই আরিফকে অনেক পছন্দ করে আর ভালোবাসে।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন

নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

আরও অন্যান্য সংবাদ


Udoy Samaj

টুইটর




Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com