,

সংগ্রাম করেই অধিকার ছিনিয়ে নিতে হয় ।। উমা চৌধুরী জলি

মাহবুব হোসেন, নাটোর প্রতিনিধি #  প্রতিবেশী দেশ ভারতের কলকাতা পৌরসভা যে বছর প্রতিষ্ঠিত হয়, একই বছর ১৮৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল নাটোর পৌরসভা। প্রায় দেড়শ’ বছরের পুরনো এ শহর প্রথমবারের মতো পেয়েছে এক নারী মেয়র। প্রায় ৫৫ হাজার ভোটারের নাটোর পৌরসভায় দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নতুন নগরমাতা নির্বাচিত  হয়েছেন উমা চৌধুরী জলি। গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী উমা চৌধুরী জলি নৌকা প্রতীকে ১৯ হাজার ২৬৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার কাছের প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির (ধানের শীষ) শেখ এমদাদুল হক আল মামুন পান ১৬ হাজার ২০৬ ভোট।

জলি চৌধুরী হিসেবে নাটোরে সুপরিচিত শত বাঁধা পেরিয়ে মেয়র নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে হয়ে ওঠেছেন প্রান্তিক নারীদের ক্ষমতায়নের প্রতীক। নাটোরের প্রথম এই নারী মেয়রের অবশ্য আরেকটি পরিচয় আছে, তিনি নাটোর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও নাটোর পৌরসভার সাবেক মেয়র প্রয়াত বাবু শংকর গোবিন্দ চৌধুরীর মেয়ে। নাটোরের মতো্ ঐতিহ্যবাহী ও পুরনো পৌরসভার প্রথম নারী মেয়র উমা চৌধুরী জলি একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেছেন নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার অনুভূতি, পৌরসভা নিয়ে তার পরিকল্পনা ও অন্যান্য প্রসঙ্গে।

*একজন নারী হিসেবে নাটোর পৌরসভায় প্রথমবার মেয়র নির্বাচিত হওয়ায় কেমন লাগছে?
জলি চৌধুরী: আমি মনে করি নাটোর পৌরবাসী আমাকে একজন নারী হিসেবে ভোট দেননি। আমার বাবার পরিচিতি এবং তার সুনামের কারণেই ভোটাররা আমাকে সমর্থন দিয়েছেন ও নির্বাচিত করেছেন। আমার বাবাjoly_bg_265884715 প্রয়াত শংকর গোবিন্দ চৌধুরী সারা জীবন ছেলে হোক মেয়ে হোক কারো মধ্যে ভেদাভেদ করেননি। নারী-পুরুষকে সমান মর্যাদা দিয়েছেন। গরীব দুখি আর সাধারণ মানুষের জন্য আজীবন কাজ করে গেছেন, আমিও সেটাই করতে চায়। তাছাড়া আপনারা জানেন এদেশে প্রধানমন্ত্রী একজন নারী, সংসদের স্পীকার এবং বিরোধী দলীয়নেতা নারী, সেদিক থেকে নারীকে কেবল নারী হিসেবে ভাবার দিন শেষ হয়ে গেছে।

* বাবার আর্দশেই কি রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া?
জলি চৌধুরী: আমার তো মনে হয়, জন্মের পর থেকেই আমি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। কারণ আমি জন্ম নেওয়ার অনেক জন্মের আগে থেকেই আমার বাবা রাজনীতির সঙ্গে জড়িত, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক হয়ে সারা জীবন কাটিয়ে গেছেন তিনি। তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে আমি সবসময় সহযোগিতা করার চেষ্টা করেছি। রাজনীতির বীজটা আমার ভেতর শিশু বয়সেই ঠাই করে নেয়। তখন থেকেই নিজেকে আওয়ামী লীগ এবং বঙ্গবন্ধুর আর্দশের সৈনিক হিসেবে নিজেকে ভাবতাম। বাবার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েই আমি প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে যুক্ত হই। তাছাড়া নাটোরবাসী জানেন, আমার বাবা দীর্ঘদিন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন, তিনি বঙ্গবন্ধু কর্তৃক গভর্ণরও নিযুক্ত হয়েছিলেন। এছাড়াও তিনি একাধিকবার এমপি ও নাটোর পৌরসভার চেয়ারম্যানও ছিলেন। নাটোরবাসী আমার বাবার কর্মকাণ্ডের প্রতি সম্মান জানিয়েই আমাকে মেয়র পদে নির্বাচিত করেছেন।

*নাটোর পৌরসভার প্রথম নারী মেয়র হিসেবে নারীর ক্ষমতায়নে কী কী কাজ করবেন।
জলি চৌধুরী: একসময় ছিলো নারীদের ভোগ্যপণ্য এবং ঘরে আটকে রাখা হতো। কিন্তু এখন আর সেই যুগ নেই। সংগ্রাম করেই অধিকার ছিনিয়ে নিতে হয়, এদেশের নারীরাও সংগ্রাম করেই প্রতিটি সেক্টরে জায়গা করে নিচ্ছে। এখন পিছনে ফিরে তাকানোর আর কোন সুযোগ নেই। শত বাঁধা পেরিয়ে আজকে যেমন জলি চৌধুরী মেয়র নির্বাচিত হয়েছে। তেমনি পার্লমেন্ট সদস্য, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, এমনকি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানও নির্বাচিত হচ্ছে। তাছাড়া পৌরসভার প্রান্তিক নারীদের জন্য কর্মসংস্থান ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রতিটি নারী যাতে নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে সেরকম কিছু করার চেষ্টা করব।

*দেড়’শ বছরের পুরনো পৌরসভাটি নানা সমস্যায় জর্জরিত এবং  নাগরিক সুবিধা বঞ্চিত, এটাকে আপনি কিভাবে দেখছেন?
430-432x332জলি চৌধুরী: প্রায় দেড়’শ বছরের পুরানো এ পৌরসভায় উন্নয়নের ছোয়া লাগেনি। বিগত দিনে দায়িত্বপালন করা একাধিক মেয়রের উদাসিনতা ও ব্যর্থতার জন্য পৌরবাসী নাগরিক সেবা পায়নি। পৌরসভার রাস্তা ঘাটের বেহাল অবস্থা, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারনে সামান্য বৃষ্টি হলেই জলজটের সৃষ্টি হয়। বর্ষায় জলাবদ্ধতার কারণে নাগরিকদের নানারকম অসুবিধার সৃষ্টি হয়। শহরের, ভাঙ্গা রাস্তাঘাট এবং রাস্তায় আলো থাকেনা। এছাড়া বর্ধিত পৌর এলাকায় রাস্তাঘাট ড্রেনেজ ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। এমনকি শহরের অনেক স্থানে এখনো বিদ্যুৎ পৌঁছেনি। নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর সময় ঘুরে ঘুরে এসব সমস্যা দেখেছি এবং চিহ্নিত করে রেখেছি। একটি আধুনিক এবং বাসযোগ্য পৌরসভা গঠনে স্থানীয় সংসদ সদস্যর সহযোগিতা নিয়ে এসব সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাবো। তাছাড়া বিগত দিনের মেয়রদের পরামর্শ এবং দলমত নির্বিশেষে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের একটি সমন্বয় কমিটি করে সমস্যা সমাধানে চেষ্টা চালিয়ে যাবো।

* নাটোরে জনবসতি গড়ে ওঠেছিল  নারদ নদকে কেন্দ্র করে। কালের বিবর্তনে ও পরিবেশ দূষণে খরস্রোতা এ নদী এখন মৃতপ্রায়। নারদ নদ নিয়ে আপনার ভাবনার কথা জানতে চাই।
জলি চৌধুরী: নারদ নদকে ঘিরে প্রায় তিনশ বছর আগে নাটোর শহরের গোড়াপত্তন ও মানুষের প্রাণচাঞ্চল্য শুরু হয়েছিল। ১৭০৬ সালে রাজা রামজীবন ও রঘুনাথ এখানে তাদের রাজধানী স্থাপন করেন। খরস্রোতা এ নারদ নদই ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম ছিল। কিন্তু আজকের নারদ নদ হারিয়েছে সেই ঐতিহ্য। সেই নারদ নদের অস্তিত্বই এখন হুমকির মুখে। নাটোরবাসীর প্রাণের দাবি হলো, এ নদকে রক্ষা করতে হবে। উজানে পাকা বাঁধ নির্মাণের কারণেই নারদ নদের স্বাভবিক স্রোতধারা বাঁধাগ্রস্ত হয়ে সরু খালে রূপান্তরিত হয়েছে। তাই নারদ নদ রক্ষার জন্য সবার আগে উজানের পাকা বাঁধ অপসারণের ব্যবস্থা নিতে চাই। ভূমিদস্যুদের অবৈধ দখল উচ্ছেদ করাকেও অগ্রাধিকার দেব। পাশাপাশি আশেপাশে গড়ে ওঠা কলকারখানার রাসায়নিক বর্জ্য যেন নারদে নিষ্কাশনের বিরুদ্ধেও জরুরী ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছি।
Natore-Pic20151231075205*আপনার ভবিষ্যত পরিকল্পনা ও স্বপ্নের কথা জানতে চাই।
জলি চৌধুরী: ভবিষ্যত পরিকল্পনা একটাই, মানুষের পাশে থাকা ও মানুষকে পাশে রাখা। ব্যক্তিজীবনে আমার এখন আর চাওয়া পাওয়ার কিছু নেই। একমাত্র মেয়ে দেশের বাইরে স্বামীর সাথে বসবাস করেন। তাই মানুষের জন্য কিছু করার জন্য রাজনীতিতে এসেছি। একটি আধুনিক পৌরসভা গঠনই এখন আমার স্বপ্ন।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন

নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

আরও অন্যান্য সংবাদ


Udoy Samaj

টুইটর




Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com