,

ফররুখ আহমদ : ইসলামী নবজাগরণের কবি ।। সফিউল্লাহ আনসারী

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কবি ফররুখ আহমদ। ইসলামী রেনেসাঁর কবি, নবজাগরণের কবি, মানবতার কবি, সংগ্রাম ও ন্যায়ের কবি ইত্যাদি নামে যাঁর পরিচিতি সে কবি ফররুখ আহমদ। অসংখ্য কবিতার রচয়িতা কবি ফররুখ আহমদ লিখেছেন-কাব্যনাট্য, মহাকাব্য, রোমান্টিক কবিতা, সনেট, ব্যঙ্গ-রসাত্মক কবিতা, শিশুতোষ ছড়া, হামদ ও নাত, ইসলামি কবিতা, আধুনিক ও দেশত্ববোধক গান  এমনকি গল্প ও প্রবন্ধ রচনায় ছিল তাঁর সিদ্ধহস্ত। 

১৯১৮ সালের ১০ জুন (তৎকালীন যশোর জেলার অন্তর্গত) বর্তমান মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার মাঝাইল গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন কবি ফররুখ আহমদ। কবির পিতা সৈয়দ হাতেম আলী ছিলেন একজন পুলিশ ইন্সপেক্টর। মা রওশন আখতার ছিলেন গৃহীনি। খুলনা জিলা স্কুল থেকে ১৯৩৭ সালে ম্যাট্রিক এবং কলকাতার রিপন কলেজ থেকে ১৯৩৯ সালে আই এ পাস করেন কবি।স্কটিশ চার্চ কলেজে দর্শন এবং ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা শুরু করা কবি ছাত্রাবস্থায় তিনি বামপন্থী রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়লেও তাঁর রাজনৈতিক দর্শনে পরিবর্তন আসে। ব্যাক্তিগত জীবনে কবি ১৯৪২ সালের নভেম্বর মাসে আপন খালাতো বোন সৈয়দা তৈয়বা খাতুন (লিলি)-এর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।

তাঁর নিজের বিয়ে উপলক্ষে কবি ফররুখ আহমদ উপহার নামে একটি কবিতা লেখেন যা সওগাত পত্রিকায় অগ্রহায়ণ ১৩৪৯ সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল। ফররুখ আহমদের ছেলেমেয়ে সংখ্যা-১১ জন। কর্ম জীবনে কবি আই জি প্রিজন অফিসে(১৯৪৩),সিভিল সাপ্লাইয়ে(১৯৪৪) এবং কলকাতার জলপাইগুড়িতে একটি ফার্মে  (১৯৪৬) চাকরি করেন। ১৯৪৫ সালে তিনি মাসিক মোহাম্মদীর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দেশ বিভাগের পর ১৯৪৮ সালে ফররুখ আহমদ কলকাতা থেকে ঢাকায় চলে এসে ঢাকা বেতারে যোগ দেন এবং জীবনের শেষ পর্যন্ত ঢাকা বেতারে চাকরি করেন ।

আদর্শবান এ কবি মাত্র ৫৬ বছর বয়সে, ১৯৭৪ সালের ১৯ অক্টোবর  ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।কবি ফররুখ আহমদের সাহিত্যের নানা শাখায় বিচরণ থাকলেও তাঁর প্রধান পরিচয় কবি। ফররুখ আহমদ কিছু সনেটও রচনা করেছেন। তাঁর রচনায় ধর্মীয় ভাবধারার প্রভাব সবচেয়ে বেশী। আরবি ও ফারসি শব্দের প্রাচুর্য তাঁর লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

ইসলামী ভাবধারায় সমর্থন থাকলেও তিনি ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক ছিলেন।যা তাঁর লেখায় উল্লেখ রয়েছে। শিশুদের জন্য পাখির বাসা, হরফের ছড়া, চাঁদের আসর, ছড়ার আসর, ফুলের জলসা রচনা করেন। ১৯৬৫ সালে বাংলা একাডেমী প্রকাশ করে পাখির বাসা। এ বইয়ে তিনি চমৎকার ছড়া লিখেছেন-আয়গো তোরা ঝিমিয়ে পড়া দিনটাতে, পাখির বাসা খুঁজতে যাব একসাথে। এই বই লিখে ইউনেস্কো পুরস্কারে ভূষিত হন। তার দ্বিতীয় শিশুতোষ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯৬৯ সালে, নাম নতুন লেখা। একই সময় তার লেখা হরফের ছড়া ও ফুলের জলসা গ্রন্থের সবগুলো কবিতা বিভিন্ন ফুলকে নিয়েই রচিত।

তৎকালীন রেডিও পাকিস্তান, ঢাকা কেন্দ্র থেকে প্রচারিত কিশোর মজলিস অনুষ্ঠান পরিচালনাও করতেন কবি। সাত সাগরের মাঝি, সিরাজাম মুনীরা, নৌফেল ও হাতেম, মুহূর্তের কবিতা, ধোলাই কাব্য, হাতেম তায়ী, নতুন লেখা,কাফেলা, হাবিদা মরুর কাহিনী, সিন্দাবাদ, দিলরুবা সহ জনপ্রিয় গ্রন্থ রচনা করে গেছেন,যা বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। সাহিত্য রচনায় কবি অনেক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন,তার মধ্যে-১৯৬০ সালে ফররুখ আহমদ বাংলা একাডেমি পুরস্কার,১৯৬৫ সনে প্রেসিডেন্ট পদক প্রাইড অব পারফরমেন্স এবং ১৯৬৬ সালে আদমজী পুরস্কার ও ইউনেস্কো পুরস্কার লাভ করেন।

১৯৭৭ ও ১৯৮০ সালে তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদক ও স্বাধীনতা পদক দেয়া হয়।কবি ফররুখ আহমদের রচনা, জীবন ও কর্মে আমরা উজ্জীবিত হই,হই আশাম্বিত সত্য-ন্যায়ের পথে চলতে।ইসলামী ভাবধারায় রচিত কবির কবিতা ও লেখা আমাদের ব্যাক্তি ও সামাজিক-রাষ্ট্রীয় জীবনে আর্দশবান মানুষ গড়ার গতিকে শানিত করে। ফররুখ আহমদ একাধারে কবি, ছড়াকার, অনুবাদক, প্রবন্ধকার, শিল্পী, গীতিকার, পরিচালক, আবৃত্তিকার হিসেবে সুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন। যা আমাদের পথচলায় অনুপ্রাণিত করে।

সংগ্রামী ও আপোসহীন কবি ফররুখ আহমদ ইসলামী রেনেসাঁ-নবজাগরণের কবি হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন যুগ যুগ ধরে, বাঙালীর চেতনা-বিশ্বাসে। কবির জন্মদিনে তাঁর আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি গভীর শ্রদ্ধায়…।(তথ্যসুত্র: ইউকিপিডিয়া)
 

ফেসবুক থেকে মতামত দিন

নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

আরও অন্যান্য সংবাদ


টুইটর




Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com